মৎস্যচাষে বিশ্বসেরা পাঁচ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের মৎস্য খাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও এক ধাপ এগিয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ মৎস্যচাষী দেশের তালিকায় স্থান করে নেওয়ার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশের মর্যাদাও ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত **‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৬’** প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বে মৎস্য ও মৎস্যচাষ খাতে মোট উৎপাদন রেকর্ড ২৩ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর উৎপাদন ছিল ১৯ কোটি ৫০ লাখ টন এবং শৈবাল উৎপাদন ৪ কোটি টন। ২০২২ সালের তুলনায় মোট উৎপাদন বেড়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। এই উৎপাদনের প্রাথমিক বাজারমূল্য প্রায় ৫৬ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৬৭ শতাংশ এসেছে সামুদ্রিক জলসীমা থেকে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণের মাধ্যমে এবং ৪৯ শতাংশ মৎস্যচাষ থেকে উৎপাদিত হয়েছে। অন্যদিকে মোট উৎপাদনের ৩৩ শতাংশ এসেছে অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে, যার ৮৪ শতাংশই মৎস্যচাষের মাধ্যমে অর্জিত।
মৎস্য ও জলজ উৎপাদনে এশিয়ার আধিপত্য এখনো অটুট। বৈশ্বিক উৎপাদনের ৭৬ শতাংশই আসে এ অঞ্চল থেকে। এর পর রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল (৮ শতাংশ), ইউরোপ (৭ শতাংশ), আফ্রিকা (৬ শতাংশ), উত্তর আমেরিকা (২ শতাংশ) এবং ওশেনিয়া (১ শতাংশ)।
২০২৪ সালে জলজ প্রাণীর মোট উৎপাদন সর্বকালের সর্বোচ্চ ১৯ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছেছে। এর ৫৩ শতাংশ এসেছে মৎস্যচাষ থেকে এবং ৪৭ শতাংশ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণের মাধ্যমে। এই উৎপাদনের প্রাথমিক বাজারমূল্য ধরা হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার।
মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনের ১১ কোটি ৮০ লাখ টন বা ৬১ শতাংশ এসেছে সামুদ্রিক অঞ্চল থেকে। বাকি ৭ কোটি ৭০ লাখ টন বা ৩৯ শতাংশ উৎপাদিত হয়েছে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে।
অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে ২০২৪ সালে ২২ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে শীর্ষে ছিল ভারত। ১৪ লাখ টন উৎপাদনের মাধ্যমে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।
এফএওর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বিশ্বে মৎস্যচাষ খাতে উৎপাদন রেকর্ড ১৪ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছেছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৯ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে জলজ প্রাণীর উৎপাদন ১০ কোটি ৩০ লাখ টন, যার মূল্য প্রায় ৩৭ হাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলার। এছাড়া শৈবাল উৎপাদন হয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ টন, যার মূল্য প্রায় ২ হাজার কোটি মার্কিন ডলার।
বিশ্বের মোট মৎস্যচাষ উৎপাদনের ৯২ শতাংশই এসেছে এশিয়া থেকে। এরপর রয়েছে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা এবং ওশেনিয়া।
বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ মৎস্যচাষী দেশ হলো চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ। এই পাঁচ দেশ মিলেই বিশ্বের মোট মাছ উৎপাদনের ৮৪ শতাংশ জোগান দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে জলজ প্রাণীর চাষও সর্বকালের সর্বোচ্চ ১০ কোটি ৩০ লাখ টনে পৌঁছেছে, যা বৈশ্বিক খাদ্য চাহিদা পূরণে মৎস্যচাষ খাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে।
মাছ উৎপাদনে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে চীন, যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৫৬ শতাংশ সরবরাহ করেছে। এরপর রয়েছে ভারত (১২ শতাংশ), ইন্দোনেশিয়া (৬ শতাংশ), ভিয়েতনাম (৫ শতাংশ) এবং বাংলাদেশ (৩ শতাংশ)। এই পাঁচ দেশ মিলে বিশ্বের মোট উৎপাদনের ৮২ শতাংশ সরবরাহ করেছে।
মৎস্যচাষে উৎপাদিত জলজ প্রাণীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৯ শতাংশ ছিল পাখনাযুক্ত মাছ, ৯ শতাংশ খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী এবং বাকি অংশ ছিল জলজ কচ্ছপ, ব্যাঙ, মোলাস্ক ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণী।
অন্যদিকে, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় মৎস্যচাষে ২০২৪ সালে উৎপাদিত হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ টন জলজ প্রাণী। এর মধ্যে ৫৩ শতাংশ ছিল মোলাস্ক, ২৪ শতাংশ পাখনাযুক্ত মাছ, ২২ শতাংশ খোলসযুক্ত জলজ প্রাণী এবং অবশিষ্ট ২ শতাংশ ছিল অন্যান্য সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণী।
সজল আহমেদ / প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: