ঢাকার মঞ্চে সিলেটের জয়জয়কার
সিলেটের ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ নাটকে মুগ্ধ রাজধানী!
রাজধানী ঢাকার দর্শকদের অবিরাম করতালির গর্জন, চোখের কোণে জমে থাকা আবেগ আর বুকভরা ভালোবাসায় সিক্ত হলো নাট্যায়ন সিলেটের অবিস্মরণীয় প্রযোজনা ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজন এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত গৌরবের “নতুন নাটকের উৎসব-২০২৬”-এর মঞ্চে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এক জাদুকরী সন্ধ্যার সাক্ষী হলো এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হল। সিলেটের নাট্যশিল্পীদের অনবদ্য পরিবেশনা যেন পুরো হলের দর্শকদের এক অন্য জগতে নিয়ে গিয়েছিল।
তরুণ নাট্যকার এখলাছ আহমেদ তন্ময়ের ক্ষুরধার রচনা এবং গুণী নাট্যজন মোস্তাক আহমেদের জাদুকরী নির্দেশনায় নির্মিত এই নাটকটি ২০২৫ সালের দেশসেরা আটটি নতুন নাটকের একটি হিসেবে এই মর্যাদাপূর্ণ উৎসবে জায়গা করে নেয়। ঢাকার বুকে সিলেট বিভাগের এই রাজকীয় প্রতিনিধিত্ব নাট্যায়ন সিলেটের ইতিহাসে এক সোনালী মাইলফলক হিসেবে খোদাই হয়ে থাকবে।
জীবনের প্রতি পরম দায়বদ্ধতা, ঘোর অন্ধকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ আর নতুন করে বেঁচে ওঠার এক অদম্য প্রত্যয়—এই নিয়েই ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’। আত্মহত্যার মতো চরম সিদ্ধান্তের বেড়াজালে আটকে পড়া কিছু মানুষের জীবন ও মৃত্যুর মধ্যবর্তী এক রহস্যময় গোলকধাঁধায় নিজেদের ভুল, অনুশোচনা আর জীবনের আসল অর্থ খোঁজার এক আকুল আকুতি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই নাটকে। সমকালীন নির্মম বাস্তবতা আর গভীর দার্শনিক ভাবনার এমন এক মেলবন্ধন মঞ্চে তৈরি হয়েছিল, যা দর্শকদের হৃদয়ে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। অভিনয়, নিখুঁত মঞ্চ-নির্মাণ আর আলোর আলোড়নে বুঁদ হয়ে নাটকের শেষ পর্যন্ত দর্শকেরা যেন নিশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিলেন!
গুণীজনদের হৃদয় নিংড়ানো প্রশংসা
প্রদর্শনী শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে মঞ্চে ছুটে আসেন দেশের প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব, নাট্যকার ও নির্দেশক জাহিদ রিপন। ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন: বর্তমান সমাজে আত্মহত্যা একটি ভয়ানক ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে যেভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল, দায়িত্বশীল এবং নান্দনিকভাবে মঞ্চে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা এককথায় অবিশ্বাস্য! নাট্যকার এখলাছ আহমেদ তন্ময়কে স্যালুট জানাই এমন সাহসী বিষয় নির্বাচনের জন্য। আর নির্দেশক মোস্তাক আহমেদ আধুনিক নাট্যভাষা ও মঞ্চনির্মাণে যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনন্য ও প্রশংসার দাবিদার।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যকলা ও চলচ্চিত্র বিভাগের পরিচালক এবং উৎসব পরিচালক দীপক কুমার গোস্বামী উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “নতুন নাটকের উৎসবের মূল সার্থকতা এখানেই, যেখানে নতুন চিন্তা ও নতুন সম্ভাবনা ডানা মেলে। ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ আমাদের সেই প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে। এই নাটক সমাজকে নতুন করে বাঁচতে শেখাবে, জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে।”
সাফল্যের এই চূড়ায় দাঁড়িয়ে নাটকের প্রাণপুরুষ ও নির্দেশক মোস্তাক আহমেদ আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, জাতীয় পর্যায়ের এমন এক রাজকীয় মঞ্চে সিলেটের গৌরব ধারণ করতে পেরে আমরা ধন্য, আমরা গর্বিত! ঢাকার দর্শকদের এই বুকভরা ভালোবাসা ও গভীর মনোযোগ আমাদের আজীবন অনুপ্রাণিত করবে। ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ কেবল একটি নাটক নয়, এটি অন্ধকারের বিরুদ্ধে, আত্মহননের বিরুদ্ধে জীবনের পক্ষে দাঁড়ানোর এক মহাবিপ্লব, এক জ্বলন্ত আহ্বান! যদি একটি মানুষও এই নাটক দেখে জীবনের মূল্য বুঝতে পারে, তবেই আমাদের শ্রম সার্থক। এই গৌরব নাট্যায়ন সিলেটের প্রতিটি অবিনাশী কর্মী ও শুভানুধ্যায়ীর।
নাটকের সফল সমাপ্তিতে অতিথিবৃন্দ যখন নাট্যায়ন সিলেটের হাতে উৎসবের স্মারক তুলে দিচ্ছিলেন, তখন পুরো প্রেক্ষাগৃহ রূপ নেয় এক আনন্দোৎসবে। করতালির জোয়ার আর দর্শকদের উপচে পড়া ভালোবাসায় হলজুড়ে তৈরি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে যাঁরা দর্শকদের কাঁদিয়েছেন, হাসিয়েছেন এবং জীবনের জয়গান গেয়েছেন, তাঁরা হলেন—মোস্তাক আহমেদ, এখলাছ আহমেদ তন্ময়, রীমা দাস, শিপন আহমদ, রুবেল আহমেদ রাজ, রিংকু মালাকার, এনামুল হক সামি, পারভেজ আহমেদ এবং মো. সাদমান তন্ময় আদিয়ান। তাঁদের প্রত্যেকের সাবলীল ও শক্তিশালী অভিনয় নাটকের মূল দর্শনকে দর্শকদের হৃদয়ের গহীনে পৌঁছে দিয়েছে।
এই মহাকাব্যিক প্রযোজনার সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন নজরুল ইসলাম মনজুর ও তুহিন খান। মঞ্চ ও পোশাকের অনন্য পরিকল্পনায় মুগ্ধ করেছেন মোস্তাক আহমেদ। আলোর খেলায় মায়াজাল বুনেছেন খোয়াজ রহিম সবুজ, প্রক্ষেপণে নিখুঁত ছিলেন বদরুল আলম এবং হৃদয়ে কাঁপন ধরানো আবহসঙ্গীতের জাদুতে জড়িয়ে রেখেছিলেন রীমা দাস ও উত্তম কাব্য।
এই গৌরবময় ও সফল মঞ্চায়নের মাধ্যমে নাট্যায়ন সিলেট বুক ফুলিয়ে আবারও প্রমাণ করল—ঢাকার বাইরেও লুকিয়ে আছে নাট্যচর্চার এক একটি শক্তিশালী ও চিন্তাশীল পাওয়ারহাউজ! ঢাকার দর্শকদের এই উষ্ণ অভ্যর্থনা আর ভালোবাসার জোয়ার বুকে নিয়ে ‘মহাকালের অন্তর্যাত্রা’ নাট্যায়ন সিলেটের ইতিহাসে সাফল্যের এক নতুন এবং অনন্য অধ্যায়ের সূচনা করল, যা আগামী দিনে মফস্বলের নাট্যচর্চাকে আরও বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার জ্বালানি জোগাবে। জয় হোক থিয়েটারের, জয় হোক জীবনের!
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: