পোলাও চালের বাজারে অগ্নিমূল্য
দেশের বাজারে হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে পোলাও চালের দামে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও গত এক মাসের ব্যবধানে বিভিন্ন জাতের পোলাও চালের দাম কেজিপ্রতি বেড়েছে সর্বোচ্চ ৩০ টাকা। একই সময়ে বস্তাপ্রতি দাম বেড়েছে ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। নিত্যপ্রয়োজনীয় এ খাদ্যপণ্যের এমন লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাধারণ ক্রেতারা।
রাজধানীর বাবুবাজার, নয়াবাজার, বাদামতলী ও কারওয়ানবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মান ও ব্র্যান্ডভেদে পোলাও চালের দাম আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই ধরনের চিত্র মিলেছে মফস্বলের বাজারগুলোতেও। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদুল আজহার আগ থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকা দাম এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
চালের বাজারের এ অস্থিরতার পেছনে ব্যবসায়ী ও আড়ৎদাররা কয়েকটি কারণের কথা বলছেন। তাদের অভিযোগ, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও মিল মালিকরা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। যৌক্তিক কারণ ছাড়াই তারা বস্তাপ্রতি ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বাড়িয়েছেন। পাশাপাশি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবও বাজারে পড়েছে বলে দাবি তাদের।
খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ আরও সরাসরি। তাদের ভাষ্য, করপোরেট গ্রুপ ও বড় মিল মালিকরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজারে পোলাও চালের সরবরাহ ও দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। কোরবানির ঈদ এবং বিয়ের মৌসুমে চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে তারা অতিরিক্ত মুনাফা করছেন। একই অভিযোগ তুলেছেন সাধারণ ক্রেতারাও।
তবে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করা হয়েছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন রোববার সন্ধ্যায় বলেন, করপোরেট কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দাম বাড়ানো বা কারসাজির অভিযোগ ভিত্তিহীন। তার দাবি, এ বছর যেসব ধান থেকে পোলাও চাল উৎপাদন হয়, সেসব জাতের ধানে মড়ক দেখা দেওয়ায় উৎপাদন কমেছে। ফলে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক ব্যবসায়ী পোলাও চাল রপ্তানিও করছেন। তার মতে, দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে এ পর্যায়ে পোলাও চাল রপ্তানি বন্ধ করা প্রয়োজন।
এদিকে, পোলাও চালের এই ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষ। বিশেষ করে ঈদ-পরবর্তী সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে বা মেজবানের আয়োজন করতে গিয়ে অনেক পরিবারকে অতিরিক্ত খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এমন আকাশছোঁয়া দাম বৃদ্ধির খবর শুনে অনেক ক্রেতাই বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
তবে বাজার বিশ্লেষকরা করপোরেট কোম্পানিগুলোর ব্যাখ্যাকে পুরোপুরি গ্রহণ করছেন না। তাদের মতে, মাত্র এক মাসে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়ে যাওয়া কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের বলেন, বাজারে চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম আগেই অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার কর ও শুল্ক কমানোর ঘোষণা দিলেও তার সুফল সাধারণ ভোক্তা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকর ভূমিকার অভাব অসাধু ব্যবসায়ীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: