ব্যাংকিং খাত সংকটাপন্ন, অর্থনীতিতে বাড়ছে ঝুঁকি সংসদে মিলন
দেশের ব্যাংকিং খাত সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ক্ষেত্রেই গভীর সংকটের মুখে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা-১২ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, সরকারের ঋণের ভার, রাজস্ব ঘাটতি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং চাঁদাবাজিকে দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।
শনিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৬তম দিনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বাজেট আলোচনায় মিলন বলেন, সরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ১৭ শতাংশে। বর্তমানে দেশে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় সংকেত বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের ঋণের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে দেশি ও বিদেশি উৎস মিলিয়ে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ১৩ হাজার ৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৭৩ কোটি টাকার সমান। আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১৯০ কোটি ডলার এবং মূলধন পরিশোধে আরও ৩৩৯ কোটি ডলার ব্যয় করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই সংসদ সদস্য। তার মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। আগের বছরের আদায়ের সঙ্গে তুলনা করলে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকার ঘাটতির আশঙ্কা রয়েছে। এতে কার্যকর বাজেট ঘাটতি প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে, যা মোট বাজেটের প্রায় অর্ধেক।
তিনি বলেন, বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৩ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ ব্যয় কমিয়ে উন্নয়ন ও জনকল্যাণমূলক খাতে গুরুত্ব বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
এডিপি বাস্তবায়নের দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরে মিলন বলেন, ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে বাস্তবায়নের হার ছিল ৯৪ শতাংশ, সেখানে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড সর্বনিম্ন ৬৮ শতাংশে নেমে এসেছে। বাস্তবায়নহীন উন্নয়ন বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলা রাষ্ট্রীয় করপোরেশনগুলোর কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বিরোধীদলীয় এই সংসদ সদস্য। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি, পরিচালন ব্যয় হ্রাস, ক্যাপাসিটি চার্জ ও ব্যাংকিং খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর জোর দেন তিনি।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ছাড়া বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয় উল্লেখ করে সাম্প্রতিক হত্যা, ধর্ষণ ও সহিংস ঘটনার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান মিলন। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি এখন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন দেখতে চায় জনগণ। গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত সম্পন্ন করার আহ্বানও জানান তিনি।
চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যের ছেলেও চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন, যা প্রমাণ করে সরকার চাইলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।
রাজধানীর নাগরিক দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরেন মিলন। তিনি বলেন, অল্প বৃষ্টিতেই ঢাকার সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে যায়। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি ও গ্যাস সংকটও নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়িয়ে তুলছে।
সজল আহমেদ / প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: