মাজারের দানবাক্সে আমলাতন্ত্রের তালা: ভক্তির আঙিনায় এ কোন নগ্ন হস্তক্ষেপ?
দান বা খয়রাতের টাকার স্বচ্ছতা কে না চায়? এই সমাজে দানের টাকার সঠিক হিসাবের বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা খুবই নগণ্য, আর সেই নগণ্যরা নিঃসন্দেহে জঘন্য হিসেবেই বিবেচিত। কিন্তু প্রশ্নটা তখনই তীব্র হয়ে ওঠে, যখন স্বচ্ছতা খোঁজার এই অতি-উৎসাহী চশমাটা সিলেক্টিভ বা পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠে। সম্প্রতি আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের বুকে যা ঘটল, তা স্রেফ কোনো প্রশাসনিক রুটিন ওয়ার্ক নয়, বরং তা সুফি-প্রেমের এক অলৌকিক দরবারে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার নগ্ন আস্ফালন।
হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক ডেগ আর দানবাক্সে আজ ঝুলছে জেলা প্রশাসনের তালা! সেখানে বসানো হয়েছে সরকারি দানবাক্স। যে মাজারগুলোকে কেন্দ্র করে শত বছর ধরে সুফি-আশেকানদের মনস্তাত্ত্বিক মেলা বসত, হৃদয়ের লেনদেন হতো, তা এখন বন্দি হবে ফাইলের লাল ফিতায়। এখন থেকে এসি রুমে বসে মানুষের আবেগ থেকে যোজন যোজন দূরে থাকা সরকার আর প্রশাসন নির্ধারণ করবে এই মরমি আঙিনার গতিপথ। এর চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!
মাজার কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য—হিসাবের জন্য তাদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। যদি জেলা প্রশাসনের সদিচ্ছা থাকত, তবে তারা আরও একবার সতর্ক করে সময় দিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব চাইতে পারত। তাতেও যদি আপত্তি থাকত, তবে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিলে কারও কিছু বলার ছিল না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নজর কেন শুধু সিলেটের এই দুটি মাজারের ওপরই আটকে থাকল? দেশের নামকরা পাগলা মসজিদের দান বাক্সে একদিনে যতো টাকা জমা হয়, সম্ভবত সিলেটের দুটি মাজারে একমাসেও তা হয় না। এই কথাটি স্রেফ নিজের অনুমান থেকে বলছি। কিন্তু এই টাকা নিয়মতান্ত্রিক ভাবে কমিটির মাধ্যমে যথারীতি আয়-ব্যয় হয়ে থাকে। সেই পাগলা মসজিদের টাকা নিয়ে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ অদ্যাবধি চোখে পড়ে নি। সেখানেও প্রসানিক হস্তক্ষেপ দেখা গেলে আমি সাধুবাদ জানাতাম।
বিগত চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি, এক শ্রেণীর মাজারবিরোধী উগ্র চক্র সিলেটের বিভিন্ন মাজারে একাধিকবার হামলা চালিয়েছে। সেই চক্রটি এখনও সক্রিয়। লোকমুখে আজ জোর গুঞ্জন—জেলা প্রশাসনের সাথে এই চক্রটির এক ধরনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। তাহলে মাজার বিরোধীদের খুশি রাখতেই কি জেলা প্রশাসনের এই আকস্মিক ও একতরফা তোড়জোড়? এই ধারণা কি খুব অমূলক?
যদি স্বচ্ছতার হিসাবই আপনার পরম লক্ষ্য হয়, তবে সিলেটে তো অসংখ্য মন্দির রয়েছে, সেগুলোকে কেন একই ব্যবস্থার আওতায় এনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হচ্ছে না? সিলেটের বহু মসজিদ এবং মাদরাসা রয়েছে, যাদের অর্থ আদায়ের বিভিন্ন উৎস থাকলেও সাধারণ মানুষ তাদের ব্যয়ের খাত সম্পর্কে কিছুই জানে না। সেই সব মন্দির, মসজিদ, মাদরাসা বাদ দিয়ে হঠাৎ করে প্রখ্যাত দুই ওলির মাজারের দানবাক্সের প্রতি আপনার চোখ আটকে থাকল কেন, জেলা প্রশাসক মহোদয়? দেখার মতো আর কিছু কি আপনার চোখে পড়ে না? অন্তত একটি মসজিদ, মাদরাসা কিংবা মন্দিরের ব্যাপারে একই ব্যবস্থা আপনি প্রয়োগ করতে পারলে নি:সন্দেহে আপনাকে মাথায় তোলে রাখতো সিলেটের মানুষ। কিন্তু সেটি কী আপনার পক্ষে আদৌ করা সম্ভব ?
শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারের ডেগ আর দানবাক্সকে যদি কেউ স্রেফ টাকাপয়সা কিংবা নানা রূপের সম্পদ জমা নেওয়ার কাঠের বা লোহার বাক্স ভাবেন, তবে তিনি মস্ত বড় ভুল করবেন। ওটা শত শত বছর ধরে চলে আসা এক অবিনশ্বর ঐতিহ্য। ওখানে যুগে যুগে জমা হচ্ছিল ভক্ত-আশেকানসহ নানা শ্রেণি-পেশা, এমনকি নানা ধর্মের মানুষের নিভৃত আকুতি, মানত আর বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়া চোখের পানি।
ওগুলো স্রেফ টাকা জমানোর কোনো উপকরণ ছিল না; ওগুলো ছিল দূর-দূরান্ত থেকে আসা কোনো মায়ের বুকভাঙা কান্না, কোনো এক অসহায় পিতার সন্তানের রোগমুক্তির আকুল আর্তি, কিংবা কোনো আশেকানের স্বেচ্ছায়, শ্রদ্ধায় সঁপে দেওয়া ভালোবাসার দলিল। আজ সেই চোখের জল আর বিশ্বাসের হিসাব কষবে হৃদয়ানুভূতিহীন আমলারা! তাদের ফাইল-কলমে সুফি-আধ্যাত্মিকতা আজ আর কোনো মরমি বিষয় নয়, এটি এখন স্রেফ এক সরকারি ‘টাকার খনি’, নিছক এক শুষ্ক-রাজস্বের খতিয়ান! মানুষের আদি ও অকৃত্রিম ভক্তিকে এখন তারা পরিমাপ করবে টাকার অঙ্কে।
সুফিবাদের মূল কথাই হলো প্রেম আর মুক্তি, যা কোনো জাগতিক আইনের তোয়াক্কা করে না। কিন্তু সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সারওয়ার আলম শাহজালাল ও শাহপরানের মাজারের শত বছরের অক্ষুণ্ণ ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। ফলে আজ দরবার প্রাঙ্গণে ভক্তিভরে জিকির করতে আসা জীর্ণশীর্ণ সাধারণ ভক্তদের চেয়ে বন্দুক আর খাকি পোশাকের সরকারি বাহিনীর আনাগোনা বেশি। ওলিদের যে আঙিনা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত আশ্রয়ের জায়গা, তা আজ প্রশাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণে এক অবরুদ্ধ দুর্গ।
অথচ এই তো কিছুদিন আগেও যখন দেশের নানা প্রান্তে সুফিদের মাজারগুলোতে একের পর এক হামলা হলো, মাজার ভাঙা হলো, আগুন দেওয়া হলো, কবর থেকে লাশ তুলে এনে পুড়িয়ে দেওয়া হলো, তখন কিন্তু এই প্রশাসন বা এই সরকারি কর্মকর্তাদের মাজার রক্ষায় কোনো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি। তখন অসহায় ভক্ত-মুরিদেরা মার খেয়েছে, আর প্রশাসন দূর থেকে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে তামাশা দেখেছে। সেই রক্ত ও অশ্রুর প্রথম অধ্যায় পার হয়ে ভক্তদের ভালোবাসায় যে মাজারগুলো এখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এখন এই সরকারি বাহিনী হাজির হয়েছে অন্য রূপে, অন্য পোশাকে—দানবাক্সের দখল নিতে!
মাজারের মূল দানবাক্স সিলগালা করে, সরকারি বন্দুকের পাহারায় রেখে এখন কি তবে সুফি সংস্কৃতির ওপর ‘দ্বিতীয় পর্যায়ের ধ্বংসযজ্ঞ’ শুরু হলো? মাজারের দানবাক্স কেড়ে নিয়ে সেখানে সুলতানি আমলের জমিদারের মতো সিন্দুক বসিয়ে কি ভক্তদের অন্তরের সেই আকুল ভক্তি পাওয়া যাবে?
ওলিদের দরবার টাকার কাঙাল নয়, হৃদয়ের কাঙাল—এই ধ্রুব সত্যটি আমলারা কোনোদিন বুঝবে না। শাহ আবদুল করিম, দুর্বিন শাহ কিংবা গিয়াসউদ্দিন আহমদের ঐতিহাসিক গানের মরমি সুর যে মাটিকে ধন্য করেছে, লোককবি নবীন সিদ্দেক আলীর গানে বাবা শাহজালালের যে ‘কুদরতি কামাল’ প্রকাশিত হয়েছে, আজ প্রশাসনের হাত পড়েছে সেখানেও।
কিন্তু প্রশাসন ভুলে যাচ্ছে, ওলিদের দরবারে লোহার তালা মারা গেলেও মানুষের অন্তরের মরমি টানে কোনোদিন তালা মারা যায় না। এই শাহজালাল-শাহপরানের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দানবাক্স ও ডেগের নয়, এই সম্পর্ক সম্পূর্ণ আত্মিক। এই আত্মিক সম্পর্ককে আমলাদের লাল ফিতায় করায়ত্ত করে শেষ রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়—ইতিহাস অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়।
সবচেয়ে বড় প্রহসন হলো—মাজারে-মাজারে যারা কোনোদিন যায়নি, যায় না এবং যাবেও না; তারাই আজ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে মাজার কীভাবে চলবে! মাজারে যারা এক-পয়সাও কোনোদিন দান করেনি, তারাই আজ অস্থির হয়ে উঠেছে মাজারের টাকার হিসাব মেলাতে! ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ এই আমলাতন্ত্রের শুষ্ক খতিয়ান যেন বাংলার সুফি-সংস্কৃতির চিরায়ত আবেগকে গ্রাস করতে না পারে, এখন সেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময় এসেছে।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: