ক্ষোভ ও আতঙ্কে এলাকাবাসী
দোয়ারাবাজারে শতবর্ষী কবরস্থানে কথিত পীরের ‘আস্তানা’
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাজিতপুর গ্রামে একটি শতবর্ষী পঞ্চায়েতি কবরস্থানে আস্তানা গেড়ে বসেছে গয়াছ মিয়া (৩৫) নামের এক যুবক। ‘স্বপ্নাদিষ্ট পীর’ ও ‘জিন সাধনার’ আড়ালে সেখানে দিনরাত মাদক সেবন এবং রাতভর অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পবিত্র কবরস্থানে এমন অপতৎপরতায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। একজন চিহ্নিত অপরাধীর এমন আস্তানাকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকায় এখন এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।
হত্যা মামলার আসামি থেকে ‘কথিত পীর’
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত গয়াছ মিয়া বাজিতপুর গ্রামেরই বাসিন্দা। সে এলাকার একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার প্রধান আসামি এবং আদালতে এ বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছিল। দীর্ঘ দিন কারাভোগের পর সম্প্রতি সে জামিনে মুক্তি পেয়ে এলাকায় ফিরে আসে।
কারামুক্তির পরপরই গয়াছ নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী দাবি করতে শুরু করে। তার দাবি, স্বপ্নে এক ‘অজ্ঞাত পীরের নির্দেশ’ পেয়ে সে এই নির্জন কবরস্থানে আস্তানা গেড়েছে। এখানে সে জিন সাধনা করে এবং মানুষকে আধ্যাত্মিক উপায়ে রোগবালাই ও সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। এই আধ্যাত্মিকতার আড়াল ব্যবহার করে বাজিতপুরের গহীন জঙ্গলে শতবর্ষী এক বটবৃক্ষের নিচে বাঁশ ও বেত দিয়ে একটি দোতলা ঘর (আস্তানা) তৈরি করেছে সে।
স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, আধ্যাত্মিকতার এই পুরো বিষয়টিই একটি সুচতুর ভণ্ডামি। বাজিতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শাহীন আলম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "গয়াছ একজন চিহ্নিত অপরাধী। সে নির্জন কবরস্থানকে বেছে নিয়েছে মূলত অপরাধের অভয়ারণ্য বানানোর জন্য। পীর সেজে সে সেখানে মাদকের আখড়া তৈরি করেছে। সন্ধ্যা নামলেই সেই জঙ্গলে বহিরাগত মাদকসেবীদের আনাগোনা বাড়ে এবং রাতভর চলে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের আসর।"
শত বছরের পুরনো পবিত্র কবরস্থানে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে। বাজিতপুর জামে মসজিদের সভাপতি সুনুর মিয়া বলেন, "এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের শত বছরের পবিত্র কবরস্থান। এখানে আমরা মৃতদের আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করতে আসি। এমন একটি পবিত্র জায়গায় মাদকের আসর বসানো চরম ধৃষ্টতা। আমরা এই আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়াসহ গয়াছের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি।"
স্থানীয় ইউপি সদস্য জুয়েল মিয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, "গয়াছ একজন হত্যা মামলার আসামি। কারাগার থেকে বের হয়েই সে যেভাবে জঙ্গলে আস্তানা তৈরি করেছে, তাতে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। যেকোনো সময় এলাকায় বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।"
এলাকাবাসীর এই আতঙ্ক ও ক্ষোভের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দোয়ারাবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। তিনি বলেন,"আমরা এই বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ধর্মীয় পবিত্রতা নষ্ট করা বা মাদকের আখড়া গড়ে তোলার কোনো সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হচ্ছে এবং দ্রুতই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"
এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং পবিত্র কবরস্থানের মর্যাদা রক্ষার্থে অনতিবিলম্বে এই আস্তানা উচ্ছেদ করে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার জন্য ঊর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বাজিতপুর গ্রামবাসী।
প্রীতম দাস/ তানজুবা তাবাসসুম
মন্তব্য করুন: