অস্তিত্ব সংকটে টাঙ্গুয়ার হাওরের দেশি মাছ: হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ও কর্মসংস্থান
দেশের মিঠাপানির মাছের অন্যতম প্রধান ভান্ডার হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গুয়ার হাওরে দেখা দিয়েছে তীব্র মাছের সংকট। এক সময় দেশি প্রজাতির অসংখ্য মাছের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত এই হাওরে এখন অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্তির পথে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, বিষ ও কারেন্ট জালের প্রয়োগ এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে হাওরের জীববৈচিত্র্য এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও তাহিরপুর উপজেলায় বিস্তৃত। প্রায় ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর আয়তনের এই হাওরে রয়েছে ৫৪টি ছোট-বড় বিল এবং অসংখ্য খাল। বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকা বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, যা স্থানীয়দের কাছে ‘সায়র’ বা ‘সাগর’ নামে পরিচিত। হাওর ও এর তীরবর্তী ৮৮টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি এই জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল।
একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরের রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, আইড়, বোয়াল, শোল, বাউশ, কৈ, শিং, পাবদা, গজার, পুঁটি, মলা, চাপিলা, কেচকি, ভেদেরাসহ নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হতো। কিন্তু বর্তমানে এসব মাছের অনেকগুলোই বিরল হয়ে পড়েছে এবং বেশ কয়েকটি প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। নাব্য সংকট, জলদূষণ এবং স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় মাছের ডিম পাড়ার উপযোগী স্থানও আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে।
মাছ সংকটের মূল কারণসমূহ: অবৈধ মৎস্য আহরণ: নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল, কারেন্ট জাল এবং বৈদ্যুতিক শক মেশিনের দেদার ব্যবহার,কৃত্রিম বিষ প্রয়োগ: বিত্তশালী কিছু ব্যক্তি ভুয়া সমবায় সমিতি গঠন করে জলমহাল ইজারা নিয়ে অধিক মুনাফার আশায় পানিতে বিষ বা রাসায়নিক প্রয়োগ করছেন। পরিবেশ দূষণ: কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং হাওরাঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে হাঁস পালন। নাব্য সংকট: হাওরের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া এবং স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হওয়া।
অবৈধ ও ধ্বংসাত্মক পদ্ধতিতে মাছ শিকারের ফলে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে দেশি প্রজাতির মাছের সংখ্যা। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রকৃত জেলে পরিবারগুলোর জীবিকায়। মাছ না পাওয়ায় অনেক জেলে পরিবার কর্মহীন হয়ে চরম অর্থকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জনাব কে এম মাহফুজুর রহমান জানান, কৃষিজমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে টাঙ্গুয়ারসহ অন্যান্য হাওরাঞ্চলে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও আবাসস্থল হুমকির মুখে পড়েছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশবান্ধব ও বিকল্প পদ্ধতি চালুর বিষয়ে মৎস্য বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: