ক্ষোভ ও হট্টগোল
সুনামগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
চলতি বছর অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ফসল হারিয়ে সুনামগঞ্জের হাজার হাজার কৃষক যখন দিশেহারা, তখন সরকারি সহায়তা প্রাপ্তির তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড স্তরের নেতাদের দাপটে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ নিয়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে বঞ্চিত কৃষকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। গতকাল রোববার (৭ জুন) সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নে তালিকা নিয়ে কৃষকদের মাঝে চরম ক্ষোভ ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। এর আগে ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ ও শাল্লাসহ বিভিন্ন উপজেলাতেও বঞ্চিত কৃষকেরা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবাননগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের তালিকায় চরম অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, কুরবাননগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আতিকুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান এবং যুবদল নেতা সোহেল ও মনির নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের বাদ দিয়ে নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ২ নম্বর ওয়ার্ডের তালিকায়: ৮০ নম্বর: ইউনিয়ন সভাপতির মেয়ে,৮১ নম্বর: ইউনিয়ন সভাপতির ভাইয়ের স্ত্রী,৮২ নম্বর: ইউনিয়ন সভাপতির ভাতিজা,৯৭ নম্বর: ইউনিয়ন সভাপতির মেয়ের জামাই।
এ ছাড়া তালিকা প্রস্তুতকারী সোহেলের আপন বোন মোছা. নাজমা বেগমের নাম রয়েছে ৮৪ নম্বরে, যার প্রায় ১৭-১৮ বছর আগে তাহিরপুর উপজেলায় বিয়ে হয়ে গেছে এবং তিনি এই এলাকার বাসিন্দা নন। তালিকায় ১০৫, ১১৭ ও ১২১ নম্বরে রয়েছে সোহেলের চাচাতো ভাই-বোনদের নাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, ৮৭, ৯০, ৯৩, ৯৫, ৯৭, ৯৮, ৯৯, ১০০, ১০২, ১০৭, ১১০, ১১২, ১১৩, ১১৫, ১২৩, ১২৪, ১২৫, ১২৭, ১৩০, ১৩২, ১৩৩ ও ১৩৪ নম্বর তালিকায় যাদের নাম রয়েছে, তাদের অনেকেরই কোনো কৃষি জমি নেই; অথচ তারা নেতাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।
তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক।
কুরবাননগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল বরকত সাংবাদিকদের বলেন, “তালিকা তারা (দলীয় নেতারা) তৈরি করে আমাদের কাছে এনেছিল, আমরা শুধু স্বাক্ষর করেছি।” তবে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে এই দায় তিনি এড়াতে পারেন না।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুলতানা জেরিন বলেন, “সহায়তার তালিকায় এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সর্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, যেসব উপজেলায় কৃষকদের সহায়তার তালিকা তৈরিতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে, সেসব উপজেলার ইউএনওদের আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার ৭টি উপজেলায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাভুক্ত করে প্রথমে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫০৪ জনের নাম পাঠানো হলেও চূড়ান্ত তালিকায় ৬৪ হাজার ৩৮৪ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪ হাজার ৬৩০ জন, বিশ্বম্ভরপুরে ২ হাজার ৪৬৬ জন, জামালগঞ্জে ৫ হাজার ১০৩ জন, শান্তিগঞ্জে ২ হাজার ৭০৩ জন, তাহিরপুরে ৯ হাজার ১৫৯ জন, ছাতকে ১ হাজার ৯৪ জন, দিরাইয়ে ১১ হাজার ৭৫৬ জন, জগন্নাথপুরে ৩ হাজার ৬০৩ জন, দোয়ারাবাজারে ১ হাজার ৪০ জন, শাল্লায় ১০ হাজার ১২৫ জন, ধর্মপাশায় ৫ হাজার ৪৩৪ জন এবং মধ্যনগরে ৭ হাজার ২৭১ জন কৃষক রয়েছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকদের দাবি, সরকারের এই মানবিক উদ্যোগ যেন কিছু লোভী নেতার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। তারা অবিলম্বে এই ত্রুটিপূর্ণ তালিকা বাতিল করে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন।
লতিফুর রহমান রাজু / ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: