৫ বছরেও চালু হয়নি হাসপাতাল, ক্ষুব্ধ মেডিকেল শিক্ষার্থীরা
দৃষ্টিনন্দন ১০ তলা ভবন দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু সেখানে নেই রোগীর চিকিৎসা, নেই শিক্ষার্থীদের ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ। হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ফলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ। এ অবস্থায় হাসপাতাল দ্রুত চালু ও নিয়মিত ক্লিনিক্যাল ক্লাস নিশ্চিতের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার (২৯ জুন) বেলা সাড়ে ১১টায় সুনামগঞ্জ পৌর শহরের আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট) এলাকায় ৫০০ শয্যার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দ্রুত চালু, একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং পর্যাপ্ত ক্লিনিক্যাল ক্লাস নিশ্চিত করার দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে রাজপথে নামেন জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যমকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
সমাবেশে শিক্ষার্থীরা বলেন, **"হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছর পার হলেও আমরা এখনও ক্লিনিক্যাল ক্লাস থেকে বঞ্চিত। হাসপাতাল ছাড়া একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী কীভাবে দক্ষ চিকিৎসক হবে? রোগীদের চিকিৎসা দেব কীভাবে?"** তারা অভিযোগ করেন, বিকল্প কোনো হাসপাতালের ব্যবস্থা না করেই মেডিকেল কলেজ চালু করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।
বক্তারা বলেন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে এখনও আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হয়নি। সামান্য জটিল রোগ হলেও রোগীদের সিলেটে যেতে হয়। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি—সবকিছুরই শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার পথেই রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। তাই জেলার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল দ্রুত চালু করা সময়ের দাবি।
আন্দোলনকারীরা জানান, ৫০০ শয্যার এই হাসপাতাল ভবনটি নির্মাণের পর বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের ২৪ জুন এবং পরে ২০২৫ সালের অক্টোবরের মধ্যে হাসপাতাল চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০২৬ সালেরও অর্ধেক সময় পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষ এখনও নানা অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে।
তারা জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের প্রতিনিধিদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, সুনামগঞ্জবাসীর এই প্রাণের দাবি প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতাল চালুর একটি **লিখিত ও সময়ভিত্তিক রোডম্যাপ** প্রকাশের দাবি জানান তারা।
সমাবেশে বক্তারা প্রশাসনের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাদের ভাষ্য, দেশের অন্য জেলায় অল্প সময়ের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু করা সম্ভব হলেও সুনামগঞ্জে পাঁচ বছরেও তা সম্ভব হয়নি। ফলে কর্তৃপক্ষের মৌখিক আশ্বাসে আর আস্থা নেই শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের।
আন্দোলনকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, দ্রুত দাবি পূরণ না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। প্রয়োজন হলে জেলার সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সমাবেশে শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন ২য় ব্যাচের প্রিয়াশ চন্দ্র দাশ, ৩য় ব্যাচের তামিমা হোসেন ও আজহারুল ইসলাম, ৪র্থ ব্যাচের ফয়সাল বাদশা, তানভীর আহমেদ ও নৃহী রায়হানা, ৫ম ব্যাচের আব্দুল্লাহ আল নোমান এবং ৬ষ্ঠ ব্যাচের কে এম সাজিদ ও শীর্ষেন্দু বিশ্বাস রোহন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার, সুনামগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক খলিলুর আহমেদ, চ্যানেল আইয়ের জেলা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম, রাজনৈতিক নেতা মুনাজ্জিদ হোসেন সুজন, হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতা ওবায়দুল হক মিলন, হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ইয়াকুব বখত্ এবং স্থানীয় নাগরিক মনছুর আলম।
উল্লেখ্য, হাসপাতাল চালু না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ইনডোর-আউটডোর ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর প্রতিবাদে গত ২১ জুন থেকে তারা সব ধরনের ক্লাস ও একাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করে অনির্দিষ্টকালের আন্দোলন ও ধর্মঘট পালন করছেন।
সজল আহমেদ / প্রীতম দাস
মন্তব্য করুন: