গুচ্ছ কবিতা
ক্ষুধার অদৃশ্য উপগ্রহ ও অন্যান্য ।। আবিদ ফায়সাল
অশ্বত্থীর স্তন
গ্রামের শেষে যে অশ্বত্থগাছ
তার শিকড়ে বাঁধা আছে এক মৃত নদীর নাভি।
লোককথা বলে—
একদা সেখানে এক মা
নিজের সন্তানদের ক্ষুধা লুকোতে লুকোতে
চাঁদের কাছে ধার নিয়েছিলেন দুধ।
চাঁদ সুদখোর ছিল।
পূর্ণিমা এলেই
সে মায়ের বুক থেকে একটু একটু আলো তুলে নিত,
আর অমাবস্যার রাতে
মায়ের দুই স্তন হয়ে যেত
দুইটি ফাঁপা শঙ্খ—
যার ভিতরে শুধু বাতাসের কান্না।
তখন মা
নিজেকে মাটিতে পুঁতে ফেললেন।
চুলগুলো হয়ে গেল শেকড়,
দুই হাত দীর্ঘ হয়ে ডালপালা,
আর স্তনের ভিতর জমে থাকা শেষ শাদা ক্ষুধা
ফুল হয়ে ফুটল
বকপাখির গলার মতো কাঁপতে কাঁপতে।
সেই থেকে
গ্রামের শিশুরা রাতে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে
পাতার দিকে মুখ তুলে বলে—
'মা, একটু দুধ দাও।'
আর গাছ তখন
তার কাণ্ডের ভেতর থেকে
ধীরে ধীরে বের করে আনে
কাঠঠোকরার ঠোঁটে জমে থাকা চাঁদের গুঁড়া।
কেউ জানে না,
আমরা যে চাল খাই
তা আসলে মৃত মায়েদের দাঁতের ভাঙা অংশ,
আর যে বৃষ্টি নামে
তা হলো আকাশে ঝোলানো
সহস্র শুকনো জরায়ুর ধোয়া জল।
এক বৃদ্ধ রাখাল বলেছিল—
যেদিন পৃথিবীর সব সন্তান
একসাথে 'মা' বলে কেঁদে উঠবে,
সেদিন সমস্ত বন
হঠাৎ দুধে ভরে যাবে—
এবং গাছেরা
নিজেদের বাকল ছিঁড়ে
স্তন বের করবে পৃথিবীর দিকে।
আমি সেই রাতের অপেক্ষায় আছি।
এখনও মাঝরাতে
অশ্বত্থগাছের নিচে গেলে শুনতে পাই—
পাতারা নয়,
আসলে অসংখ্য অনাথ জিভ
অন্ধকার চুষছে।
ক্ষুধার অদৃশ্য উপগ্রহ
পুকুরের কালো জলে চাঁদ
পড়ে আছে ভাঙা থালার মতন—
তার পাশ ঘেঁষে শুয়ে আছে কয়েকটি সাপ,
যেন অন্ধ লিপিকর
জলের গতরে লিখছে প্রাচীন দুর্ভিক্ষের ইতিহাস।
পোনাগুলো গোল হয়ে ঘুরছে—
তাদের দেখে মনে হয়
ভেজা আকাশে কেউ একমুঠো রুপা ছুঁড়ে দিয়েছে
আর সেই রুপা এখনও ভয় পেয়ে কাঁপছে।
দূরে রান্নাঘরে মা
মসলা বাটছে শিলপাটার ওপর।
শব্দ উঠছে—
যেন সবুজ বজ্রপাতের হাঁটু ভাঙার শব্দ।
সরিষা তেলের গন্ধ
ধীরে ধীরে উঠোন পেরিয়ে আসে
একটি পুরোনো লোকগানের মতন,
যার ভিতরে ধানক্ষেত, বৃষ্টি
আর মৃত নৌকার ছায়া লুকানো।
বোরো চালের নতুন ভাত
হাঁড়ির ভিতরে ফুলে উঠছে—
মনে হয় শাদা মেঘেরা ক্ষুধার দেশে আশ্রয় নিয়েছে।
আমি তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে
দেখি—
মা আসলে মানুষ নন,
তিনি এক মৎস্যমাতা,
তার আঁচলে নদীর আঁশ লেগে আছে,
চোখে কাদামাটির নক্ষত্র।
তিনি জানেন
প্রতিটি মাছের ভিতরে একটা জলজ অন্ধকার থাকে,
যেমন মানুষের ভিতরে থাকে অঘোষিত কান্না।
সাপগুলো ধীরে ধীরে সরে যায়।
পুকুর আবার নিশ্বাস নেয়।
রাত্রি তার ভেজা চামড়া বদল করে।
আর আমি দেখি—
এক থালা গরম ভাতের ওপর
ভাজা পোনাগুলো পড়ে আছে
যেন সদ্য নিভে যাওয়া গ্রহের ছোটো ছোটো দেহ,
যাদের ঘিরে এখনও
ঘুরছে ক্ষুধার অদৃশ্য উপগ্রহ।
জানালা ও পাখির ছায়া
বিকেলের শেষে
খোলা জানালায় এসে বসে এক টুকরো রোদ্দুর—
অসুস্থ বৃদ্ধের বুকে রাখা
অন্তিম গরম সেঁক যেন।
দূরে কারখানা-ধোঁয়া
আকাশের নীল শার্টে
কালো বোতাম আটকে দেয়।
একটি পাখি উড়ে যায়—
তার ছায়া পড়ে থাকে
নিচের নদীতে,
যেন জলও গোপনে
আকাশ হতে চেয়েছিল।
রাত নামলে
রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে ওঠে
অন্ধ ভিক্ষুকের হাতে ধরা
নীরব মোমের বাতির মতন।
একজন মানুষ তখন
আপন ক্লান্তি খুলে রেখে
বারান্দায় দাঁড়ায়—
মনে হয়
সে পৃথিবী নয়,
নিজেকেই দূর থেকে দেখছে নীরবে।
এই জানালাটি কারও অপেক্ষা,
এই উড়ে যাওয়া ছায়া কারও অসমাপ্ত চিঠি,
আর এই শহর—
অসংখ্য না-বলা কথার
পাথুরে সিন্দুক।
তবু মাঝরাতে
একফালি চাঁদ
সব কোলাহলের ওপর
শাদা কাপড় বিছিয়ে দেয়—
যেন পৃথিবী এখনও
মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বৃক্ষ ও মানুষ
প্রথমে মানুষ ছিল না—
ছিল বৃক্ষের সবুজ তপস্যা।
বট তার জটাজালে বেঁধে রাখত বাতাস,
অশ্বত্থ পাতায় পাতায় লিখত আকাশের ভাষ্য,
শিমুলের রক্তবর্ণ ফুলে জ্বলত আদিম অগ্নিস্মৃতি।
তখন দেবতাসকল ক্ষুধার্ত হলে
গাছগুলো ফল হয়ে নেমে আসত থালায়,
পাখিরা গাইত প্রার্থনার গান,
নদী এসে শিকড়তলায় নামিয়ে রাখত জলের কলস।
লোকমুখে শোনা যায়—
মানুষকে বানানোর আগে
মাটি আর বৃষ্টির সঙ্গে
পরামর্শ করেছিল এক বৃক্ষ।
সে বলেছিল—
আমার ছায়া থেকে কিছু দাও
আমার মমতা থেকে কিছু দাও
আর ভুলে যেও না—
তাদের হাতে কুঠারও দিও।
তারপর মানুষ জন্মাল।
সেই থেকে গাছ
নিজেদের কাঠ দিয়ে বানিয়েছে মানুষের দরজা,
শরীর পুড়িয়ে তাড়িয়েছে মানুষের শীত,
পাতা দিয়ে ঢেকেছে আদিম লজ্জা।
তবু প্রতিটি ধারালো অস্ত্রের আঘাতে
তারা কাণ্ডে লিখেছে নতুন একটি বলয়—
মানুষের পাপের আখ্যান নয়,
বৃক্ষের দীর্ঘ ক্ষমাপত্র।
আজও অরণ্যগভীরে
সবচেয়ে পুরোনো বৃক্ষটি দাঁড়িয়ে আছে—
এক প্রাচীন ঋষির মতো।
সে জানে—
ক্ষণিক মানুষের ক্রোধ,
অনন্ত ছায়ার বংশ।
তাই নিধনের পূর্বেও
ফলে ফলে উজাড় হয় বৃক্ষ,
পত্রে পত্রে আশ্রয় তোলে,
আর ঘাতকের মাথার উপর
মেলে রাখে তার শেষ সবুজ আকাশ।
মৃত্যুর সামনেও
আকাশের দিকে তোলে
তার বাহু—
মৃত্যু তাকে কৃপণ করতে পারে না
কুকুর ও নদী
গলায় ঝুলন্ত বাঁধা ইট
নদীর সলিলে ভেসে ওঠে—
একটি নিরীহ কুকুরের অন্তিম নিশ্বাস
ব্রিজের ওপরে
কয়েকটি হাসি দানবের মতন দাঁড়িয়ে থাকে
নিচে স্রোত নিভৃতে শেখায়
বাঁচতে চাওয়া কোনও অপরাধ নয়
নদী অনেকক্ষণ
নিক্ষিপ্ত একটি শরীরের জন্য ঢেউ তুলে কাঁদে
আকাশে পাখিরা
ডানায় ডানায় ফিরিয়ে আনে নীরব শোকের সংবাদ
এই কুকুরটি কারও পৃথিবীর শেষ বিশ্বাস
এই হত্যাকারী কোনও-কোনও মানুষের হিংস্র মুখোশ
আর হাসতে থাকা দৃশ্য-ধারণকারী দর্শকেরা?
—আমাদের মানবিক অস্তিত্বের সবচেয়ে গভীর জিজ্ঞাসা।
//
(আবিদ ফায়সাল। কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক।)
রোদ্দুর রিফাত
মন্তব্য করুন: