ভুয়া কাগজে নবজাতক বিক্রি, দিল্লিতে আন্তঃরাজ্য চক্র ধরা
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নবজাতক শিশু কেনাবেচার একটি আন্তঃরাজ্যীয় চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। একটি বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক দরিদ্র পরিবারের শিশু সংগ্রহ কিংবা চুরির মাধ্যমে এনে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বিক্রি করত বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানায়, ভারতের রাজস্থানসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নবজাতক শিশু সংগ্রহ করে দিল্লিতে আনা হতো। পরে ভুয়া জন্মসনদ ও হাসপাতালের নথিপত্র তৈরি করে শিশুদের বৈধভাবে জন্ম নেওয়া বলে দেখিয়ে ক্রেতাদের কাছে হস্তান্তর করা হতো।
ঘটনার সূত্রপাত হয় দিল্লির পাহাড়গঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগ থেকে। তিনি জানান, একটি নির্দিষ্ট নারীকে নিয়মিত নবজাতক শিশু কোলে নিয়ে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। এ তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে।
পরে জ্যোতি ওরফে কমলেশ নামে এক নারীকে নজরদারিতে নেয় পুলিশ। এক নারী পুলিশ সদস্য ক্রেতা সেজে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং শিশু কেনাবেচার আলোচনা শুরু করেন। চুক্তি অনুযায়ী অগ্রিম ২০ হাজার রুপি দেওয়ার কথা ছিল। পরে ৫ জুন এক নবজাতক হস্তান্তরের সময় তাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে তার সহযোগী শালু, ললিত, প্রতিভা ও বিপিনের নাম প্রকাশ পায়। এরপর তাদেরও গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানে তাদের কাছ থেকে প্রায় ৩ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে এবং এক মাসের কম বয়সী পাঁচ নবজাতককে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তদন্তে আরও জানা যায়, পশ্চিম দিল্লির রোহিণী এলাকার বেগমপুরে অবস্থিত হীরা মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল এই চক্রের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অভিযোগ অনুযায়ী হাসপাতালের মালিক ডাক্তার বিবেকী পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন।
পুলিশের ভাষ্যমতে, শিশুদের হাসপাতলেই রাখা হতো এবং বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই রাখা হতো। পাশাপাশি ভুয়া জন্মসনদ ও নথি তৈরি করে তাদের বৈধভাবে জন্ম নেওয়া শিশু হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।
মূল্য নির্ধারণে ভয়াবহ তথ্যও উঠে এসেছে তদন্তে। কন্যাশিশু সংগ্রহ করা হতো প্রায় ১ লাখ রুপিতে এবং বিক্রি করা হতো ৩–৪ লাখ রুপিতে। অন্যদিকে ছেলেশিশু ২ লাখ রুপিতে কিনে ৬–৮ লাখ রুপিতে বিক্রি করা হতো।
রোহিত রাজবীর সিং, ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি), জানিয়েছেন পুরো লেনদেন হাসপাতালকেন্দ্রিকভাবে পরিচালিত হতো এবং ডাক্তার বিবেকী মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করতেন।
পরে গুজরাটের সবরকান্থা এলাকা থেকে সাবাভাই গামার ওরফে কালিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দরিদ্র পরিবারের কাছ থেকে শিশু সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। গুজরাট, হরিয়ানার পানিপথ এবং মধ্যপ্রদেশর গোয়ালিয়র থেকেও একাধিক শিশুক্রেতাকে শনাক্ত ও আটক করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত তদন্তে জানা গেছে, এই চক্র গত এক বছরে অন্তত ৩০টি নবজাতক বিক্রি করেছে। উদ্ধার হওয়া শিশুদের প্রকৃত অভিভাবক শনাক্তের চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি শিশু কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া পাঁচ নবজাতক বর্তমানে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির তত্ত্বাবধানে রয়েছে। তাদের বিষয়ে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
সজল আহমেদ
মন্তব্য করুন: