জৈন্তাপুরে মেলা বন্ধের দাবিতে কাল বিশাল সমাবেশ

আসছে কঠোর কর্মসূচি

জৈন্তাপুরে মেলা বন্ধের দাবিতে কাল বিশাল সমাবেশ

তাহির আহমদ

১৮/০৬/২০২৬ ২৩:৩৫:০০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের ঐতিহাসিক ও জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থান জৈন্তাপুর উপজেলার ‘জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ি’ প্রাঙ্গণে মেলার নামে প্রাচীন পুরাকীর্তি ধ্বংসের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। ‘আদিবাসী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’ নামক একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে মাসব্যাপী তথাকথিত ‘শিল্প ও পণ্য মেলা’র এই তোড়জোড় শুরু হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরিবেশবাদী ও ঐতিহ্যপ্রেমী সংগঠনগুলোর কঠোর অবস্থানের মুখে অবশেষে গত বুধবার (১৭ জুন) মেলাটি জরুরি ভিত্তিতে বন্ধের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় মাসব্যাপী মেলার তোড়জোড় করা ‘আদিবাসী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’র কোনো অস্তিত্ব বা কার্যক্রম সিলেটে কখনো দেখা যায়নি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের উন্নয়নে এই সংগঠনের বিন্দুমাত্র ভূমিকা না থাকলেও এর সভানেত্রী রাখি মনি সিনহা সিলেটে এক আলোচিত নাম। মেলা ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত রাখি মনি প্রায় এক যুগ ধরে সিলেট থেকে ‘লাপাত্তা’ ছিলেন। সিলেটে না থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে তিনি মেলার নামে বাণিজ্য করে বেড়িয়েছেন। তার ঘনিষ্ঠজনদের মতেই, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের উন্নয়নের সাথে এই সংগঠনের কোনো সম্পর্ক নেই; বরং ‘আদিবাসী’ তকমা ব্যবহার করে প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে মেলা করাই এর মূল উদ্দেশ্য।


গত ৯ জুন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ইস্যু করা মেলার অনুমতিপত্রে মেলা পরিচালনা ব্যবস্থাপক হিসেবে হাসি দেবীর নাম উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত হাসি দেবীর ব্যক্তিগত সেলফোনে কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, ‘আদিবাসী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’র সভাপতি রাখি মনি সিনহার মোবাইল নম্বর না পাওয়ায় মেলা বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।


এদিকে জৈন্তাপুরে ঐতিহ্য ধ্বংসের এই মেলা বন্ধের দাবিতে রাজপথে নামছেন স্থানীয় জনতা। আগামীকাল শুক্রবার (১৯ জুন) জুম্মার নামাজ শেষে জৈন্তাপুর বাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ১৭ পরগণার মুরুব্বিদের এক জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত বৈঠক থেকে মেলা বন্ধে কঠোর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে বলে জৈন্তাপুরের এক গণমাধ্যমকর্মী নিশ্চিত করেছেন।


ওই গণমাধ্যমকর্মী আরও জানান, মেলা মাঠের কার্যক্রম পরিদর্শনকালে আয়োজকদের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়। তখন আয়োজক দাবিদার একজন মণিপুরী নারী নিজের নাম গোপন রেখে দম্ভোক্তি করে বলেন, “এই মেলা সরাসরি সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রীর নির্দেশক্রমে হচ্ছে। সুতরাং মেলা বন্ধ নিয়ে কোনো গোষ্ঠীর চক্রান্তকে আমরা তোয়াক্কা করছি না।”


এদিকে জৈন্তাপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুলতান হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সারাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে এক ধরনের ধস নামে। পরবর্তীতে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যবসায়ীরা যখন ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের নামে এমন মেলা আয়োজন নিঃসন্দেহে জৈন্তাপুরের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।”


প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এই নামসর্বস্ব সংগঠনের আড়ালে গত ১২ জুন জৈন্তাপুরের ঐতিহাসিক ইরাবতী মাঠে (জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়ির মাঠ) মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার অবকাঠামো নির্মাণকাজের শুভ উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সুনন্দা রায় এবং জৈন্তাপুর থানার তদন্ত ওসি ওসমান গনির উপস্থিতি সচেতন মহলকে ক্ষুব্ধ ও বিস্মিত করেছে। ইতোমধ্যে মেলা প্রাঙ্গণে ট্রাক ও ভারী সামগ্রী প্রবেশের সময় ঐতিহাসিক রাজবাড়ির প্রাচীন প্রবেশদ্বারের (গেট) ক্ষতিসাধনের খবরও পাওয়া গেছে।


জৈন্তার রাজবাড়িতে মেলার নামে এই ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রথম সোচ্চার হন পরিবেশবাদীরা। গত ১৬ জুন পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরা’ (DHORA)-এর কেন্দ্রীয় সংগঠক আবদুল করিম কিম নিজের ফেসবুক আইডিতে এক দীর্ঘ ও তথ্যবহুল পোস্টের মাধ্যমে এই আয়োজনের তীব্র সমালোচনা করেন।


তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন, “জৈন্তেশ্বরী বাড়ি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয়, এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত জাতীয় ঐতিহ্য। পুরাকীর্তি আইন, ১৯৬৮ (Antiquities Act, 1968) অনুযায়ী, জেলা প্রশাসক (ডিসি) প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে উপেক্ষা করে কোনো বেসরকারি সংস্থাকে সংরক্ষিত ঐতিহ্যবাহী স্থানে মেলা বা উৎসব করার অনুমতি দিতে পারেন না। যদি ডিসি অফিস এমন অনুমতি দিয়ে থাকে, তবে সেই প্রশাসনিক আদেশটি আইনিভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ।”


আইনি ধারা উল্লেখ করে তিনি আরও জানান, পুরাকীর্তি আইনের ১০, ১২ ও ১৮ ধারা অনুযায়ী সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের চূড়ান্ত অভিভাবক প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। আইন অমান্য করে ঐতিহ্য ধ্বংস বা অপব্যবহার করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই প্রতিবাদী পোস্টের পর সিলেটের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়।


তীব্র বিতর্ক ও প্রতিবাদের মুখে গত ১৭ জুন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয় থেকে সিলেট জেলা প্রশাসককে (ডিসি) মেলা বন্ধের জন্য এক জরুরি নির্দেশনা পত্র (স্মারক নম্বর: ৪৩.২৩.১৯০০.০০০.১৩৩.০১.০০০২.২২.৩৬৫) প্রেরণ করা হয়েছে।


চিঠিতে বলা হয়—এই মেলা আয়োজন পুরাকীর্তি আইন ১৯৬৮-এর ১২(৩)(গ) ও ১৯(১) ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ ও ২৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের মূল চেতনার অবমাননাকর। একই সাথে, মেলাসামগ্রী বহনের সময় প্রাচীন গেটের ক্ষতি হওয়ার বিষয়টিকেও চিঠিতে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠির শেষাংশে, জৈন্তেশ্বরী রাজবাড়িসহ উপজেলার অন্য সকল প্রত্নস্থলের সুরক্ষার স্বার্থে এই মেলার আয়োজন জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করার এবং ভবিষ্যতে এই প্রাঙ্গণে কোনো ধরনের মেলা, সভা বা সমাবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য সিলেট জেলা প্রশাসককে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জৈন্তাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনন্দা রায় জানান, “মেলা বন্ধের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি আদেশের কথা শুনেছি। তবে নির্দেশনাটি এখনও আমাদের হাতে পৌঁছায়নি। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে চিঠি পাওয়া মাত্রই সে অনুযায়ী তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

জড়িতদের জবাবদিহিতার দাবি


এলাকাবাসী ও ঐতিহ্যপ্রেমীদের দাবি, শুধু মেলা বন্ধ করাই শেষ কথা নয়; দেশের আইন ও সংবিধান লঙ্ঘন করে যারা একটি সংরক্ষিত জাতীয় ঐতিহ্যের ভেতরে বাণিজ্যিক মেলার অনুমতি প্রদানের সাথে জড়িত ছিলেন, তাদেরকেও অনতিবিলম্বে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধ্বংস করে কোনো রূপ ‘উৎসব’ বা ‘বাণিজ্য’ চলতে দেওয়া হতে পারে না।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: