প্রশাসনের ‘নমনীয়’ তদারকি, গোয়াইনঘাটে বেপরোয়া বালু দস্যুরা

প্রশাসনের ‘নমনীয়’ তদারকি, গোয়াইনঘাটে বেপরোয়া বালু দস্যুরা

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

২৭/০৬/২০২৬ ২৩:২০:৫৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ইজারার শর্ত ভঙ্গ, ড্রেজার দিয়ে অবৈধ বালু উত্তোলন, আর তার জেরে একের পর এক বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হওয়া—সিলেটের সীমান্তঘেঁষা গোয়াইনঘাটে এসব কোনো নতুন সংবাদ নয়। প্রকৃতির চোখজুড়ানো রাজ্য হিসেবে পরিচিত এই গোয়াইনঘাটে দিন-রাত চলছে বালুর রাজ্যে এক নির্মম তাণ্ডব। এই ধ্বংসযজ্ঞের বিপরীতে প্রশাসনের বাঁধাধরা উত্তরও মুখস্থ— "অভিযান চলছে, অভিযোগ প্রমাণ হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" কিন্তু বাস্তবে অভিযোগের স্তূপ বাড়লেও মেলে না কার্যকর কোনো পদক্ষেপ। রাজনৈতিক সখ্যতা আর অদৃশ্য আতাঁতের বলয়ে সব আইনি নিষেধাজ্ঞাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পিয়াইন নদীর বুক চিড়ে চলছে বালু উত্তোলনের বিরামহীন মহোৎসব।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের হাজীপুর বালুমহালে এবার ইজারার শর্ত পুরোপুরি লঙ্ঘন করে চলছে ড্রেজার মেশিনের তাণ্ডব। স্থানীয়দের দাবি, নির্ধারিত ইজারাভুক্ত এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে কয়েক হাজার ড্রেজার মেশিন দিয়ে দিন-রাত বালু চুরির খেলা চলছে। যার ফলে ফসলি জমি, বসতঘর, এমনকি ঐতিহ্যবাহী জাফলং চা-বাগানের খেলার মাঠসহ কয়েকটি গ্রাম এখন তীব্র ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর হাজীপুর বালুমহালের ইজারা পায় হাফিজ আব্দুল্লাহর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান 'মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ'। ইজারার শর্ত অনুযায়ী পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের লাটি, লাবু, কালিজুরি ও দক্ষিণ প্রতাপুর মৌজায় শুধুমাত্র সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। নির্ধারিত এলাকার বাইরে গিয়ে পশ্চিম জাফলং, গোয়াইনঘাট সদর ও মধ্য জাফলং ইউনিয়নের উত্তর প্রতাপপুর, লুনি, আমবাড়ি ও দক্ষিণ প্রতাপপুর এলাকায় অবাধে বসানো হয়েছে হাজারো নিষিদ্ধ ড্রেজার মেশিন।


স্থানীয়রা জানান, প্রতাপপুর ও পাঁচহাতিখেলের পিয়াইন নদীর আনন্দ খাল এলাকায় গত কয়েক মাস ধরে পেলোডার মেশিন দিয়েও বালু উত্তোলন চলছে। এতে খালের তীরে সৃষ্টি হয়েছে গভীর ও ঝুঁকিপূর্ণ অসংখ্য গর্ত। এই ধ্বংসযজ্ঞের ঠিক পাশেই রয়েছে জাফলং চা-বাগানের তিনটি ঐতিহ্যবাহী ফুটবল মাঠ, শত শত একর ফসলি জমি ও গ্রামীণ জনবসতি।


ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর সরাসরি অভিযোগ, লুনি গ্রামের খায়রুল আমিন, কামরুল ইসলাম, ফয়জুল ইসলাম, তোফায়েল আহমদ ও দেলোয়ার হোসেনসহ ৪০-৫০ জনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই দিন-রাত বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয়দের সরবরাহ করা একাধিক ভিডিও ও ছবিতে দেখা গেছে, দিনের আলো তো বটেই, রাতের আঁধারেও শক্তিশালী টর্চলাইটের আলো জ্বালিয়ে শতাধিক মানুষ নির্বিঘ্নে বালু তুলছে। আর দিনের বেলায় কয়েক হাজার ড্রেজার মেশিনে বালু উত্তোলন করে প্রতিদিন কয়েকশ বাল্কহেড ও কার্গো বোঝাই করে পাঠানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কর্মরত শ্রমিকদের তথ্যমতে, এখান থেকে প্রতিদিন কয়েক লাখ ঘনফুট বালু তোলা হয়, যার দৈনিক বাজারমূল্য ২ থেকে ৩ কোটি টাকারও বেশি!


অভিযোগ রয়েছে, জাফলং এলাকায় অবৈধভাবে বালু ও পাথর উত্তোলনকারী এই চক্রের সদস্যরা নতুন নয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধে গত এক যুগে ২৫ থেকে ৩০টি পর্যন্ত মামলা হয়েছে, কিন্তু অদৃশ্য খুঁটির জোরে তারা সবসময়ই পার পেয়ে যায়।


সর্বশেষ গত ১৩ জানুয়ারি ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় দক্ষিণ প্রতাপপুরের বাসিন্দা মাহবুব হোসেন বুলবুল বাদী হয়ে খায়রুল ও নুরুলসহ আটজনের বিরুদ্ধে মারধরের মামলা করেন। এর আগে গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর এলাকাবাসীর পক্ষে এমদাদুর রহমান জেলা প্রশাসকের কাছে নদীভাঙন ও বসতভিটা বিলীনের বিরুদ্ধে লিখিত আবেদন করেন। তারও আগে ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিল্লাল হোসেনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিনিয়র সহকারী কমিশনার রিপামনি দেবী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা ফাইলবন্দিই থেকে গেছে। এমনকি ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হক ফুটবল মাঠ রক্ষায় জেলা প্রশাসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি।


এই সর্বগ্রাসী বালু উত্তোলনের কারণে জাফলং চা-বাগানের লুনি ফুটবল মাঠ এবং দক্ষিণ প্রতাপপুরের আরও দুটি খেলার মাঠ এখন বিলুপ্তির পথে। অন্যদিকে লুনি গ্রামের অমৃকা লাল ও কুলন্দ নাথ, এবং দক্ষিণ প্রতাপপুরের আব্দুল জলিল, আবুল হোসেন, কমল নাথসহ অনেকের বসতঘর যেকোনো সময় নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে। হাজীপুর এলাকার ভুক্তভোগী হেলেনা বেগম ও তরিক উল্লাহ জানান, ড্রেজারের কারণে তাদের ফসলি জমি ও শেষ সম্বল বাড়িঘর নদীতে চলে যাচ্ছে, অথচ প্রশাসন নির্বিকার।


অভিযোগের তীর যার দিকে, সেই খায়রুল আমিন বরাবরের মতোই দাবি করেন, "বালু উত্তোলনে আমি জড়িত—এমনটি কেউ বলতে পারবে না। হাজীপুর বালুমহাল ইজারায় গেছে, তারা কীভাবে তুলছে তারাই জানে।"


ইজারাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী হাফিজ আব্দুল্লাহও দায় এড়িয়ে বলেন, "আমি আমার নির্ধারিত মৌজা থেকে সনাতন পদ্ধতিতে বালু তুলছি। ড্রেজার দিয়ে কারা বালু তুলছে, তা আমার জানা নেই।"


তবে এবার স্থানীয় প্রশাসনের কণ্ঠে কিছুটা নমনীয় সুর মিলেছে। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী স্বীকার করেছেন, "বালু উত্তোলনে খায়রুলসহ কয়েকজন জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য আমরা পেয়েছি। সম্প্রতি সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে এবং উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি মামলাও করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।"


তবে প্রশাসনের এই 'অব্যাহত অভিযানের' আশ্বাস কতটুকু ফলপ্রসূ হয়, নাকি বরাবরের মতো তা আতাঁতের চাদরে ঢাকা পড়ে—তা দেখার অপেক্ষায় এখন গোয়াইনঘাটের বিপর্যস্ত মানুষ।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: