মরুর বুকে লাল-সবুজের গর্জন
রূপকথার মতো দুবাই কাঁপালো সিলেটের ইত্তেহাদ
পারিবারিক চাপ, করোনা মহামারীর নির্মম ধাক্কা কিংবা ক্যারিয়ার ধ্বংসের হুমকি দেওয়া সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ইনজুরি—কোনো প্রতিকূলতাই দমাতে পারেনি তার ২২ গজের প্রেমকে। সব বাধা-বিপত্তির দেয়াল ভেঙে, সমস্ত শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে মরুভূমির দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রিকেট মাঠে এখন এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ‘ইত্তেহাদ’! সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার এই কৃতি সন্তান বর্তমানে দুবাইয়ের ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেটে অলরাউন্ডার হিসেবে রীতিমতো রাজত্ব করছেন, ছড়াচ্ছেন লাল-সবুজের দ্যুতি।
ইত্তেহাদের ক্রিকেটের হাতেখড়ি হয়েছিল ২০১৪ সালে। শুরু থেকেই বল হাতে গতি আর সুইংয়ের জাদুতে নজর কাড়েন সবার। মৌলভীবাজার জেলা দলের তৎকালীন সফল কোচ রাসেল আহমেদ (যিনি বর্তমানে ইংল্যান্ডে অবস্থান করছেন) প্রথম দেখাতেই চিনেছিলেন এই হীরার টুকরোকে। কোচের দক্ষ গাইডলাইন আর সাহসে ভর করে ২০১৪ সালেই অনূর্ধ্ব-১৪ জেলা দলে ডাক পান তিনি। এরপর ক্রিকেটের প্রতি চরম একাগ্রতা দেখে ২০১৬ সালে তার জায়গা হয় দেশের ক্রীড়াবিদ গড়ার সবচেয়ে বড় কারখানা—বিকেএসপিতে (BKSP)।
বিকেএসপির অধ্যায় শেষ করে যখন বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঘরে ফিরলেন, ঠিক তখনই ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস! "ক্রিকেট খেলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার, ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব নয়"—আমাদের সমাজের চেনা এই চশমা পরা পারিবারিক ধারণার মুখোমুখি হতে হয় তাকেও। খেলা ছেড়ে দেওয়ার জন্য আসতে থাকে তীব্র পারিবারিক চাপ। কিন্তু যার রক্তে ক্রিকেট, তাকে কি চার দেয়ালে আটকে রাখা যায়?
কোচ রাসেল আহমেদের দেওয়া সেই আত্মবিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে ২০১৮ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ ইয়ং ক্রিকেটার্স লিগে (YCL) বড় সুযোগ পান তিনি। তবে এবার বাধা হয়ে দাঁড়ায় বৈশ্বিক মহামারী করোনা। থমকে যায় মাঠ, থমকে যায় স্বপ্ন। আর করোনা শেষ হতে না হতেই যোগ হয় মারাত্মক ইনজুরি। মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়ে বাধ্য হয়েই একসময় প্রিয় ক্রিকেটকে 'আলবিদা' বলে দেন ইত্তেহাদ।
পারিবারিক দায়িত্বের কঠিন বোঝা কাঁধে নিয়ে ২০২৩ সালে একদম সাধারণ এক প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে দুবাইতে পাড়ি জমান ইত্তেহাদ। ভেবেছিলেন ব্যাটে-বলে হয়তো আর কখনোই হাত ছোঁয়ানো হবে না, সবুজ গালিচায় আর ওড়ানো হবে না লাল-সবুজ পতাকা। কিন্তু ভাগ্য যাকে ক্রিকেট মাঠের জন্যই বানিয়েছে, তাকে কি মাঠের বাইরে রাখা যায়? দুবাই যাওয়ার কিছুদিন পর বন্ধু জাকিরের হাত ধরে সেখানকার লোকাল ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পান তিনি।
আর মাঠে ফিরেই যেন ম্যাজিক! দুবাই কিংসের হয়ে নিজের অভিষেক ম্যাচেই মাত্র ৪ ওভার বল করে ২৪ রান খরচায় তুলে নেন ৪টি বিধ্বংসী উইকেট! প্রবাসের ক্রিকেট মহল সেদিনই টের পেয়েছিল—এক নতুন বাঘের আগমন ঘটেছে মরুর বুকে!
ক্যারিয়ারের শুরুতে বোলার হিসেবে পরিচিতি পেলেও দুবাইয়ের মাটিতে ইত্তেহাদ নিজেকে চেনালেন এক রুদ্রমূর্তি অলরাউন্ডার হিসেবে। সম্প্রতি এক ম্যাচে তার ব্যাট থেকে এসেছে এক অবিশ্বাস্য টর্নেডো ইনিংস। মাত্র ৬ রানের জন্য ডাবল সেঞ্চুরি মিস করলেও ৬৪ বলে ১৯৪ রানের এক চোখধাঁধানো অপরাজিত ইনিংস খেলে ক্রিকেট ভক্তদের স্তম্ভিত করে দেন তিনি! এখানেই শেষ নয়, আরেকটি নিশ্চিত হারতে বসা ম্যাচে লোয়ার অর্ডারে নেমে মাত্র ১৩ বলে ৩৭ রানের এক ক্যামিও ইনিংস খেলে দলকে এনে দেন এক অবিশ্বাস্য রূপকথার জয়!
সব প্রতিকূলতা জয় করে ইত্তেহাদ এখন দুবাই ফার্স্ট ডিভিশন ক্রিকেটের নিয়মিত এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পারফর্মারদের একজন। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দূর প্রবাসের তপ্ত বালুকাধামে মৌলভীবাজার তথা লাল-সবুজের পতাকাকে গর্বের সাথে উঁচিয়ে ধরেছেন এই হার না মানা লড়াকু। ইত্তেহাদের এই ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানোর অবিশ্বাস্য গল্প বাংলাদেশের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে থাকা স্বপ্নবাজ তরুণদের বুকভরা অনুপ্রেরণা জোগাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই!
মীর্জা ইকবাল/ তাহির আহমদ
মন্তব্য করুন: