অভ্যন্তরীণ বলয় ও পদ ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে মৌলভীবাজার বিএনপি

তারেক রহমানের চরম ক্ষোভ

অভ্যন্তরীণ বলয় ও পদ ভাগাভাগির দ্বন্দ্বে মৌলভীবাজার বিএনপি

নিজস্ব প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার

২৮/০৬/২০২৬ ০০:৩৪:২৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

দীর্ঘ ১৯ মাসেও সম্মেলন করতে না পারায় চরম সাংগঠনিক স্থবিরতায় নিমজ্জিত মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি। তবে এই স্থবিরতার নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র বলয়ভিত্তিক কোন্দল। স্থানীয় পর্যায়ে বিবদমান গ্রুপগুলোর কাদা ছোড়াছুড়ি ও প্রভাব বিস্তারের লড়াই শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পর্যন্ত। গত ১৭ জুন মৌলভীবাজার সফরকালে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে সরাসরি ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তৃণমূলের একাংশের নেতাকর্মীরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অধীনস্থ সব ইউনিটের কাউন্সিল শেষ করে দ্রুত জেলা সম্মেলন আয়োজনের কড়া তাগিদ দিয়েছেন দলীয়প্রধান।


দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপিতে মূলত দুটি স্পষ্ট বলয় এখন মুখোমুখি অবস্থান করছে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে এম নাসের রহমানকে সভাপতি ও মিজানুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা বিএনপির সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই এই দুই শীর্ষ নেতার অনুসারীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় এবং দল দুটি ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ে।


পরবর্তীতে এই ত্রিধাবিভক্ত কোন্দল মেটাতে কেন্দ্র থেকে হস্তক্ষেপ করা হয়। ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর ফয়জুল করিম ময়ুনকে আহ্বায়ক এবং আব্দুর রহিম রিপনকে সদস্যসচিব করে একটি ৩২ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। কিন্তু তাতেও কোন্দল থামেনি, বরং বলয়ভিত্তিক মেরুকরণ আরও স্পষ্ট রূপ নেয়। নাসের-ময়ুন বনাম মিজান-রিপন—এই দুই অলিখিত বলয়ের চাপা দ্বন্দ্বের জেরে দীর্ঘ ১৯ মাসেও এই কমিটি জেলা সম্মেলন সম্পন্ন করতে পারেনি। ৫টি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটের সম্মেলন ঝুলে থাকায় আটকে আছে মূল জেলার মূল কাউন্সিল।


গত ১৭ জুন মৌলভীবাজারের স্থানীয় দুসাই রিসোর্টে জেলা ও সিলেট বিভাগীয় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার মতবিনিময় সভায় বসেন তারেক রহমান। সেখানে তৃণমূলের একাংশ সরাসরি দলীয়প্রধানের কাছে জেলার বলয়ভিত্তিক রাজনীতির ক্ষতিকর প্রভাব ও সাংগঠনিক স্থবিরতার চিত্র তুলে ধরেন। সব শুনে তারেক রহমান চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন, কোনো বলয় বা কোন্দল বরদাশত করা হবে না। তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঝুলে থাকা ৫টি ইউনিটের কাউন্সিল শেষ করে মূল জেলা সম্মেলন আয়োজনের চূড়ান্ত নির্দেশ দেন।


দলীয়প্রধানের কড়া নির্দেশনার পর নড়েচড়ে বসেছেন তৃণমূলের নেতারা। কমলগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন জানান, "দলীয়প্রধানের নির্দেশনা পাওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব কমলগঞ্জ উপজেলা কমিটির কাউন্সিল আয়োজনের প্রক্রিয়া চলছে। ইতিমধ্যে ইউনিয়নের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু হয়েছে।"


জেলা সম্মেলনকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজার বিএনপিতে এখন নেতৃত্ব পরিবর্তনের জোর হাওয়া বইছে। তৃণমূলের একটি বড় অংশ চাচ্ছে, কোনো সিলেকশন বা পকেট কমিটি নয়, বরং সরাসরি কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন ও গতিশীল নেতৃত্ব আসুক। বর্তমানে শীর্ষ পদের দৌড়ে আলোচনায় রয়েছেন হেভিওয়েট চার নেতা। এদের মধ্যে সভাপতি পদের লড়াইয়ে এম নাসের রহমান (সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য) এবং ফয়জুল করিম ময়ুন (বর্তমান আহ্বায়ক ও সাবেক মেয়র)।


সাধারণ সম্পাদক পদের লড়াইয়ে আছেন মিজানুর রহমান (সাবেক সাধারণ সম্পাদক) এবং আব্দুর রহিম রিপন (বর্তমান সদস্যসচিব)।


সার্বিক বিষয়ে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ুন বলেন, "নানা প্রতিকূলতা ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে আহ্বায়ক কমিটি বসে ছিল না। আমরা দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে কাজ করেছি। দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে ত্যাগী ও যোগ্যদের নিয়ে একটি সুন্দর পূর্ণাঙ্গ কমিটি উপহার দেওয়াই এখন আমাদের প্রধান লক্ষ্য।"


দলের চেইন অব কমান্ড এবং তারেক রহমানের কড়া নির্দেশনার পর আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি বলয়ভিত্তিক কোন্দল কাটিয়ে নতুন নেতৃত্বের পথে কতটা সফলভাবে এগোতে পারে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: