দ্বিতীয় দফা অগ্নিকাণ্ডের ২১ বছরপূর্তি আজ
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র অচলাবস্থায় ফেলে রাখলে লাভ কার?
দেশের দ্বিতীয় আবিষ্কৃত বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভার সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র। একসময় পার্শ্ববর্তী ছাতক সিমেন্ট কারখানার পাশাপাশি ছাতক পাল্প ও কাগজ কারখানা চলতো টেংরাটিলার গ্যাসে। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি ও ২৪ জুন দু’দফা বিস্ফোরণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে আইনি জটিলতা নাকি সীমান্তের ওপারের অদৃশ্য কোনো আন্তর্জাতিক সমীকরণ—এই প্রশ্নকে সামনে রেখে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটি।
টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র অচলাবস্থায় ফেলে রাখার পেছনে প্রতিবেশী দেশ ভারতের ভূ-রাজনৈতিক ও খনিজ স্বার্থ জড়িত থাকতে পারে বলে গভীর আশঙ্কা ও গুঞ্জন তৈরি হয়েছে খোদ সীমান্ত সংলগ্ন জনপদে। আজ ২৪ জুন টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র ট্রাজেডির দ্বিতীয় দফা ভয়াবহ বিস্ফোরণের ২১ বছর পূর্তি হতে চললেও দীর্ঘ এই সময়ে খনিটি সচল করার কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ ও রহস্যের দানা বাঁধছে।
ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণে দেখা যায়, টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র এলাকা থেকে ভারতের মূল সীমান্তরেখা এবং মেঘালয়ের খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ পাহাড়ি অঞ্চলের আকাশপথের দূরত্ব মাত্র ৭ থেকে ১০ কিলোমিটার, যা ভূগর্ভস্থ গ্যাস রিজার্ভারের গঠনের দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি যৌথ সীমান্ত আধার হওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
খনিজ বিজ্ঞানীদের মতে, মাটির নিচের গ্যাস বা তেলের কোনো সুনির্দিষ্ট কাঁটাতারের সীমানা থাকে না, বরং এক সীমানার খনি বন্ধ রেখে তার মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বে ওপারে যদি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রিলিং বা গ্যাস উত্তোলন প্রকল্প চালানো হয়, তবে ‘ড্রেনেজ ইফেক্ট’ বা চোষন প্রক্রিয়ার কারণে বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে থাকা গ্যাস প্রাকৃতিকভাবেই সীমান্ত পার হয়ে ভারতের ওপারে চলে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক আশঙ্কা প্রবল। ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি প্রথম দফা এবং একই বছরের ২৪ জুন দ্বিতীয় দফা নাইকোর ব্লো-আউটের পর আন্তর্জাতিক আদালত ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘ইকসিড’ (ICSID) কানাডীয় কোম্পানি নাইকোকে দায়ী করে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার রায় দিলেও খনিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাষ্ট্র এখনও নির্বিকার।
স্থানীয় সচেতন মহল ও প্রবীণ বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, দীর্ঘ ২১ বছর ধরে বাংলাদেশের এই খনিটি অলস ফেলে রাখার সুযোগে ওপার থেকে ভারত ক্রমাগত তাদের সীমান্তে খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলন সচল রেখেছে, যার ফলে দেশের বিলিয়ন ডলার মূল্যের জাতীয় সম্পদ নীরবে হাতছাড়া হয়ে ভারতের পকেটে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে এখন জনমনে তীব্র সংশয় দানা বাঁধছে। দেশের তীব্র জ্বালানি সংকটের এই সময়ে চড়া দামে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানি করা হলেও, ভারতের স্বার্থ রক্ষা বা কোনো অদৃশ্য আন্তর্জাতিক চাপেই কি টেংরাটিলার বিপুল গ্যাস মজুত মাটির নিচে বন্ধ রেখে নষ্ট করা হচ্ছে—এমন প্রশ্ন তুলে অবিলম্বে এই খনির ভূগর্ভস্থ সুরক্ষায় নতুন করে সমীক্ষাকরণ ও খনিটি সচল করে দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে আসার দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
টেংরাটিলা গ্রামের বাসিন্দা শের মাহমুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘দু’দফা অগ্নিকাণ্ডের পর টেংরাটিলা ও এর আশপাশের এলাকার পরিবেশ ও প্রতিবেশগত যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা দুইদশকেও কাটিয়ে উঠা সম্ভব হয়নি। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদেরকে আজোবধি পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়নি। আমরা বছরের পর বছর ধরে আশায় আশায় আছি কবে এই খনিটি আবারো চালু হবে। কিন্তু দুঃখজনক আজোবধি খনিটি চালুর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’
সুরমা ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান হারুন অর রশীদ জানান, ‘সম্প্রতি বাপেক্সের এমডিসহ উচ্চ পর্যায়ের একটি টিম টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। তবে কবে নাগাদ এই গ্যাসক্ষেত্রটি চালু হবে সুনির্দিষ্ট ভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি। এলাকাবাসীসহ আমাদের সবার প্রাণের দাবি পরিত্যক্ত টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রটিকে সচল করে উৎপাদনে নিয়ে আসা হোক। এতে একদিকে আমাদের এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে, জীবনমান উন্নয়ন হবে অন্যদিকে দেশের জ্বালানীর চাহিদা পূরণ হবে।'
হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটি’র (হাউস) নির্বাহী পরিচালক ও পরিবেশকর্মী সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, ‘প্রায় দুই দশক ধরে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময়ী এই প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্রটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখার কোনো মানে হয়না। নতুন করে সমীক্ষা চালিয়ে গ্যাসক্ষেত্রটিকে দ্রুত উৎপাদনে নিয়ে আসার জন্য বর্তমান সরকারে নিকট আমরা সুনামগঞ্জবাসী জোরদাবি জানাই।’
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, ‘টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র চালুর বিষয়ে কোনো ধরনের নির্দেশনা আমাদের কাছে এখনো আসেনি। এব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা থাকলে বাপেক্স বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে।’
এবিষয়ে জানতে বাপেক্সের টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের ইনচার্জ প্রকৌশলী এম. এম. নাজিম উদ্দিনের মোবাইল নাম্বারে একাধিক বার কল দেওয়া হলেও তিনি কল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: