ওসমানীর সিনিয়র নার্স অরবিন্দুর সকল অপকর্মের ফাইল যাচ্ছে দুদকে

ওসমানীর সিনিয়র নার্স অরবিন্দুর সকল অপকর্মের ফাইল যাচ্ছে দুদকে

তাহির আহমদ

২৬/১০/২০২৫ ০৫:৩৯:১১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেট নার্সিং ইন্সটিটিউট থেকে ১৯৯৭ ইংরেজিতে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সম্পন্ন করে ২০১০ সালে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্সিং পেশায় যোগদান করেন অরবিন্দু দাস। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার বারালি গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। অরবিন্দুর পিতার নাম গোপাল চন্দ্র দাস। কিন্তু নার্সিং পেশায় যোগ দিয়ে অরবিন্দু হাতে পেয়ে যান আলাদীনের চেরাগ। চেরাগ ঘঁষেই অরবিন্দু এখন বাড়ি,গাড়ি,ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ একাধিক প্রেমিকাও চালাচ্ছেন দাপটের সাথে। এবার অরবিন্দুর সকল অপকর্মের ফাইল যাচ্ছে দুদকের হাতে। হাসপাতালে কর্মরত বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 


যেভাবে শুরু

নার্সিং পেশায় যোগ দেয়ার বছরের মাথায় অরবিন্দু জরুরী বিভাগের ইনচার্জের দায়িত্ব পেয়ে যান। সেই থেকে আর পিছু ফিরে থাকাতে হয় নি। একের পর এক হাতে ধরা দিতে থাকে সকল অপকর্ম। এই অপকর্মের জোরেই হাতে আসতে থাকে কাড়ি কাড়ি টাকা। তখন থেকেই অরবিন্দুর সখ্যতা গড়ে উঠে হাসপাতালের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে। এর জের ধরেই তিনি প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। বদলী বাণিজ্য, চাকুরী, আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে অরবিন্দু প্রধান ভূমিকা পালন করতেন। একইসাথে হাসপাতালের সরকারি ঔষধ পত্র পাচার ছিল অরবিন্দু দাস ও তার সহযোগীদের অন্যতম কাজ। এই কাজে কোনো নার্স কাজে বাধা হলে, তাকে বদলী করে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হতো। অরবিন্দুর সহযোগি ছিল হাসপাতালের বহুল আলোচিত নার্স নেতা পরিমল বণিক, রেখা বনিক এবং শিউলী আক্তার। যাদের কর্মকাণ্ড একাধিকবার গণমাধ্যমে স্থান পেয়েছে। এই চক্রের ইশারায় এখনো চলছে সিলেট ওসমানী হাসপাতাল। অভিযোগ রয়েছে- বর্তমান নার্স এসোসিয়েশনের সাথে অরবিন্দু দাসের ঘনিষ্ট সম্পর্ক। ফলে অরবিন্দুর সকল অপকর্ম সম্পন্ন হয় নার্স এসোসিয়েশনের নেতাদের সাথে অলিখিত চুক্তির বিনিময়ে। হাসপাতালের একটি বিশ্বস্থ সূত্র জানায়, অরবিন্দুর সাথে মাখামাখি সম্পর্ক থাকা নার্স শাহানাজ কে অবৈধভাবে রেখে দিয়েছেন হোস্টেলের ইনচার্জ হিসাবে। এই অনিয়মের বিরুদ্ধে অনেক রিপোর্ট হওয়া সত্বেও শাহনাজ বহাল তবিয়তে এখনো হোস্টেলের দায়িত্বে রয়েছেন। 


ফ্যাসিস্টের দোসর

গেল বছরের ৫ আগষ্টের আগে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিভিন্ন কর্মসূচীসহ নির্বাচনী প্রচারেও কাজ করতো অরবিন্দু দাস। নিজেকে আওয়ামী পন্থী দাবি করে সেই সময় সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে নিয়মিত উঠাবসা ছিল অরবিন্দুর। কিন্তু ৫ আগষ্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতির পর নিজের অপকর্ম আড়ার করার উদ্দেশ্যে তিনি সিলেট থেকে ঢাকায় বদলীর আবেদন করেন। বদলী আবেদনের পর থেকে তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য এখনও দৌড়ঝাঁপ করছেন তিনি।  

চব্বিশের গণ অভ্যুত্থানে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলার ঘটনায় মামলার আসামী অরবিন্দু দাস। গেল বছরের ৪ ডিসেম্বর বিস্ফোরক আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার বাদি নগরের তোপখানার ছিদ্দেক মিয়ার ছেলে রাশেদ আহমদ। মামলায় উল্লেখ করা হয়, গেল জুলাই আন্দোলনে অরবিন্দু দাসসহ অপরাপর আসামীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে আন্দোলন কারীদের উপর গুলি বর্ষণ করে। মামলায় আসামী করা হয় ৯০ জনকে। অরবিন্দু দাস এই মামলার ৪৪ নং আসামী। অরবিন্দু দাসের উপর আরও একাধিক মামলা থাকলেও তিনি এখনো ওসমানীতে বহাল তবিয়তে। উপরন্তু দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে তোলা সিলেটের একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অপকর্ম রক্ষায় তিনি এখন গা ঢাকা দিতে মরিয়া। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছেন বদলীর। বদলী নিশ্চিত করতে দপ্তরের এক কর্মকর্তার সাথে ২০ লাখ টাকার চুক্তি করেছেন বলে হাসপাতালের এক সুত্র দাবি করেছে। 


যতো ব্যবসা-বানিজ্য অরবিন্দুর 

অরবিন্দু দাসের ব্যাপারে খোঁজ নিতে গেলে বের হয়ে আসে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।  হাসপাতালের কয়েকজন নার্স নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, নার্সের চাকুরী দিয়ে কর্মজীবন শুরু হওয়া অরবিন্দু ১৫ বছরেই এখন শতকোটির টাকার বালিক। এখন বাড়ি, গাড়ি এমনকি একাধিক নারীর সাথেও সখ্যতা রয়েছে অরবিন্দুর। হাসপাতালের অনেকেই এসব বিষয় জানলেও ভয়ে কেউ তখন মুখ খুলতো না। ৫ অগষ্টের পট পরিবর্তনের পর অনেকেই নানা তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি- অরবিন্দু দাসের বদলীর আগেই দ্রুত গ্রেপ্তার করে তার সম্পদের হিসাব নিতে হবে। এ বিষয়ে দুদকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা। সিলেট নগরে রয়েছে অরবিন্দুর বেশ কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এর কোনটিতে তিনি একক আবার কোনটিতে তিনি পার্টনার হিসেবে রয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর মধ্যে সিলেটের মেন্দিবাগস্থ হোটেল গ্র্যান্ড সুরমার তিনি পরিচালক। জিন্দাবাজারে রয়েছে পার্টনারশিপ আরও একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের নাম দ্যা লাক্সারি রেস্টুরেন্ট। একটি রিসোর্ট রয়েছে অরবিন্দু দাসের। তাছাড়া আখালিয়ায় ফ্রেন্ডস আই হসপিটালেও মালিকানা অরবিন্দু দাসের। নিজের জন্য কেনা বসতভিটাসহ আরও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান রয়েছে বলে হাসপাতালের একটি সুত্র দাবি করেছে। ওই সুত্র অনুযায়ী অরবিন্দু দাস এখন নিজের অপকর্ম গা ঢাকা দিতেই বদলীর প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।


যেভাবে বদলীর চেষ্টা

নিজের অপকর্ম ঢাকা দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করছেন অন্যত্র বদলির। সুযোগ বোঝে নিজের পরিবারকেও পাঠিয়ে দিয়েছেন রাজধানীতে। সেখানে থাকছেন স্ত্রী সন্তান। সন্তানরা লেখাপড়া করছেন ঢাকাতেই। অথচ নার্সের চাকুরী দিয়েই সন্তানদের লেখাপড়াসহ সবকিছু বহন করছেন একা মাত্র এক ব্যক্তি। বিষয়টি অবাক করার মতো হলেও অসম্ভবকে সম্ভব করাই অরবিন্দু দাসের কাজ। সেটি তিনি করেও চলছেন। কিন্তু এবার আর সিলেট থাকতে ইচ্ছুক নন তিনি। যতো দ্রুত সম্ভব চাকুরী বদলীর আবেদন করে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন এই সিনিয়র স্টাফ নার্স। হাসপাতালের অন্তত ৩ থেকে ৪ জন নার্স জানিয়েছেন, আরবিন্দু আগে নিজেই বদলী বাণিজ্য করতেন। বদলী বাণিজ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সাথে ভালো সখ্যতা রয়েছে অরবিন্দুর। ফলে বিগত দিনে বদলী বাণিজ্য থেকে তার ইনকাম ছিল বেশ উল্লেখযোগ্য। আবার হয়রানী মূলক বদলীও করিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার মেয়াদকালীন অরবিন্দু ছিলেন, ওসমানীর নার্সদের মধ্যে এক মূর্তিমান আতঙ্ক। 


বদলীর আবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী-অরবিন্দু দাস সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চাকুরীতে যোগদান করেন ২০১০ সালে ৭ অক্টোবর। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি বদলীর আবেদন করেন গেল বছরের ২১ নভেম্বর। বদলীর কারণ হিসেবে অরবিন্দু উল্লেখ করেন, লেখাপড়ার কারণে নিজের সন্তানরা রাজধানীতে অবস্তান করছেন এবং নিজের স্ত্রীও রয়েছেন সন্তানদের সাথে। এ অবস্তায় সিলেট থেকে নিয়মিত ঢাকায় যাওয়া-আসা খুবই কষ্টকর বলে তিনি আবেদন পত্রে উল্লেখ করেন। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে মানসিক বিভাগের পুরুষ ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালনকারী অরবিন্দু দাস রাজধানীর জাতীয় মাসনিক স্বাস্থ্য ইন্সিটিটিউটে বদলী হতে চান বলে আবেদন পত্রে উল্লেখ করেন।


এ ব্যাপারে অভিযুক্ত অরবিন্দু দাসের সাথে কথা বলার জন্য মুঠোফোনে কয়েকবার চেষ্টা করে সাড়া পাওয়া যায় নি। পরে মুঠোফোনে প্রতিবেদকের পরিচয় দিয়ে বার্তা প্রদান করা হলে তাতেও সাড়া দেন নি অরবিন্দু।  


এ রহমান

মন্তব্য করুন: