সুনামগঞ্জের অহংকার ‘সুখাইড় জমিদার বাড়ি’: সংরক্ষণের দাবি এলাকাবাসীর
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলায় তিন শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা ঐতিহ্যবাহী ‘সুখাইড় জমিদার বাড়ি’ আজ কালের গহ্বরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। মোগল নির্মাণশৈলীর কারণে হাওরবেষ্টিত এই অঞ্চলের মানুষের কাছে যা একসময় ‘রাজ মহল’ হিসেবে পরিচিত ছিল, তা এখন চরম অবহেলায় জরাজীর্ণ। তবে এই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে আগামী প্রজন্মের কাছে জীবন্ত ইতিহাস তুলে ধরতে এটিকে অনতিবিলম্বে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত করার জোরালো দাবি উঠেছে। একইসঙ্গে, হাওরের অপার সৌন্দর্যের সাথে এই ঐতিহাসিক স্থাপনার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এটিকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, সুধীজন ও ইতিহাসপ্রেমীরা।
সুখাইড় জমিদার বাড়ির ইতিহাস যেমন গৌরবময়, তেমনই বৈচিত্র্যময়। ইতিহাসের পাতা উল্টে জানা যায়, মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ১৬৯১ সালে ভারতের হুগলি অঞ্চল থেকে আসাম যাওয়ার পথে কালিদহ সাগরের (যা বর্তমানে সুনামগঞ্জের বিশাল হাওরাঞ্চল) স্থলভূমির প্রাকৃতিক রূপে মুগ্ধ হন মহামাণিক্য দত্ত রায় চৌধুরী। তিনি এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে ধর্মপাশার সুখাইড় এলাকায় বিশাল জমি ক্রয় করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এর মাধ্যমেই ভাটি অঞ্চলে সুখাইড় জমিদার বংশের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
মহামাণিক্য দত্ত রায় চৌধুরীর মৃত্যুর পর তাঁর যোগ্য বংশধর জমিদার মোহনলাল জমিদারির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৬৯৫ সালে তিনি প্রায় ২৫ একর জায়গার ওপর এক বিশাল ও দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। মোগল ও স্থানীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সংমিশ্রণে চুন-সুরকি ও পাথর দিয়ে তৈরি এই প্রাসাদটি সে সময় সমগ্র ভাটি বাংলায় ‘হাওরের রাজ মহল’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
এককালে এই জমিদারির সীমানা ছিল বিশাল। ধর্মপাশার গজারিয়া নদীর উত্তর পার থেকে শুরু করে সুদূর ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাদের শাসনাঞ্চল। জমিদারদের সুবিশাল প্রাসাদে তখন ছিল প্রধান রাজপ্রাসাদ, অন্দরমহল, প্রাচীন দুর্গা মন্দির (যা এখনো টিকে আছে), দৃষ্টিনন্দন বাংলো ঘর ও কাছারি ঘর (প্রজাদের খাজনা আদায়ের স্থান),জলসা ঘর (নৃত্য ও সঙ্গীতের জন্য), বিশাল গুদাম ঘর ও খাসকামরা।
এই জমিদারদের অধীনে ছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য। হাওরাঞ্চলের প্রধান অর্থনৈতিক উৎস ছিল জলমহাল ও কৃষি। জমিদারদের সরাসরি মালিকানায় ছিল প্রায় ২০টি বড় বড় বিশাল বিল ও নদী, যার মধ্যে অন্যতম ধানকুনিয়া বিল ও চারদা বিল, কাইমের দাইড় ও সোনামোড়ল, পাশুয়া, ছাতিধরা, ধারাম, রাকলা বিল,বৌলাই ও নোয়া নদী
প্রজাদের ওপর ধার্যকৃত খাজনা, এই বিপুল জলমহাল থেকে আহরিত মাছ এবং চারপাশের বনজসম্পদই ছিল এই জমিদারির আয়ের প্রধান উৎস। তাদের নিজস্ব একটি লাঠিয়াল ও পাহারাদার বাহিনী ছিল, যারা জলমহালগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করত।
সুখাইড় জমিদার বাড়ির সাথে জড়িয়ে আছে বহু রোমাঞ্চকর ঘটনা। লোকমুখে প্রচলিত আছে, জমিদারের ১০ টি হাতি ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে তৎকালীন ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার এই জমিদার বাড়ি পরিদর্শনে আসেন। তিনি জমিদারদের হাতিতে চড়ে নিকটবর্তী টাঙ্গুয়ার হাওরে শিকার করতে যান। সে সময় গভীর জঙ্গল থেকে তিনটি বাঘ একসাথে তাঁর হাতিকে আক্রমণ করে। বাঘের গর্জন ও আকস্মিক আক্রমণে ভয়ে বেলেন্টিয়ার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
এমন সংকটময় মুহূর্তে সুখাইড়ের তৎকালীন বীর জমিদার মথুর চৌধুরী নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে গুলি করে তিনটি বাঘকেই হত্যা করেন। পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে ইংরেজ প্রশাসক বেলেন্টিয়ার জমিদার মথুর চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ নিজের ব্যবহৃত একটি ঐতিহ্যবাহী মূল্যবান রাইফেল তাঁকে উপহার দেন, যা দীর্ঘদিন জমিদার বংশের গৌরব হিসেবে সংরক্ষিত ছিল।
সুখাইড় জমিদার বাড়ির ইতিহাস শুধু ভোগ-বিলাসের নয়, এটি এ অঞ্চলের শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সাথেও যুক্ত। ১৯২২-২৩ সালের দিকে সুখাইড় জমিদারদের অন্যায় শোষণ ও ‘নানকার’ (বিনা মজুরিতে কাজ করানো প্রথা) ব্যবস্থার বিরুদ্ধে স্থানীয় সাধারণ কৃষক ও মেহনতি মানুষ ফুঁসে ওঠে। জমিদার বাড়িকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্রবল ‘নানকার বিদ্রোহ’ তৎকালীন জমিদারি প্রথার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। এটি ছিল এ অঞ্চলের কৃষকদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক অবিস্মরণীয় এবং রক্তক্ষয়ী অধ্যায়, যা বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।
১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর এই বিশাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। জমিদারদের বংশধরেরা আস্তে আস্তে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েন। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ২৫ একরের বিশাল রাজপ্রাসাদটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে থাকে। বর্তমানে মূল ২৫ একর জায়গার চার ভাগের মধ্যে বড়বাড়ি, মধ্যমবাড়ি ও ছোটবাড়ি কোনোমতে টিকে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, যথাযথ দেখভালের অভাবে রাজমহলের প্রাচীন দেয়ালের চুন-সুরকি ও পাথর খসে পড়ছে। বহু জায়গায় বড় ফাটল ধরেছে এবং লতাপাতায় ঢেকে গেছে প্রাচীন স্থাপনাগুলো। স্থানীয় প্রবীণদের ধারণা, এই জমিদার বাড়ির মাটির নিচে এখনো বহু মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান ও ইতিহাস চাপা পড়ে আছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিশাল এই স্থাপনা সংস্কার অসম্ভব জানিয়ে জমিদার বাড়ির বর্তমান বংশধর মোহন চৌধুরী বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন পর্যটকরা আমাদের এই ঐতিহাসিক বাড়িটি দেখতে আসেন। কিন্তু এত বিশাল বাড়ি ব্যক্তিগতভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার যদি জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে এটি রক্ষা করতে এগিয়ে আসে, তবে আমরা পূর্ণাঙ্গ সহযোগিতা করব।
সুনামগঞ্জের বিশ্ব ঐতিহ্য ‘টাঙ্গুয়ার হাওর’ দেখতে আসা হাজারো পর্যটকের জন্য এই জমিদার বাড়িটি হতে পারে একটি বাড়তি ও অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
এ বিষয়ে রাজাপুর উত্তর ইউনিয়নের ৪ নং ওয়ার্ড মেম্বার বাবুল মিয়া জোর দাবি জানিয়ে বলেন, সুখাইড় জমিদার বাড়ি আমাদের এই অঞ্চলের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল। সঠিক দেখভালের অভাবে এই ‘রাজ মহল’ আজ ধ্বংসের মুখে। আমরা সরকারের কাছে অনতিবিলম্বে এটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নিয়ে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছি।
এই স্থাপনার বহুমুখী সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে সুখাইড় গ্রামের সাবেক শিক্ষক অসমঞ্জয় কুমার দাশ বলেন, বর্তমান সরকার যদি এই ভবনটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয়, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের গৌরবময় ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবে। পাশাপাশি, একে একটি পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা হলে এই হাওরাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেকারত্ব দূর হবে এবং সরকারের বিপুল রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে।
সুখাইড় জমিদার বাড়ি রক্ষায় স্থানীয়দের এই যৌক্তিক দাবির সাথে একমত পোষণ করেছে স্থানীয় প্রশাসনও। ধর্মপাশা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্জয় ঘোষ আশ্বস্ত করে বলেন, সুখাইড় জমিদার বাড়িটি আমাদের অঞ্চলের অত্যন্ত গৌরবময় একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে এবং সরকারিভাবে দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের আওতায় আনতে আমরা ইতিমধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগও এই বিষয়ে অবগত আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি সুখাইড় জমিদার বাড়ির ঐতিহাসিক সৌন্দর্যকে যদি এক সুতোয় গাঁথা যায়, তবে সুনামগঞ্জ দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো উদ্ধার এবং প্রাচীন রাজমহলের সংস্কার শুধু হাওরের ইতিহাসকেই রক্ষা করবে না, বরং তা আগামী প্রজন্মের জন্য এক উন্মুক্ত জাদুঘর হিসেবে কাজ করবে। তাই কালের সাক্ষী এই রাজ মহলকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত করে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
প্রীতম দাস/ সজল আহমদ
মন্তব্য করুন: