ধর্ম অবমাননার জের
তাহিরপুরে হিন্দু পল্লীতে হামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এমপি কামরুল
সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট বাজারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্বস্ত করতে শুক্রবার (২৬ জুন) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। এ সময় তাঁর সঙ্গে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) দুপুরের দিকে বাদাঘাট ইউনিয়নের গড়কাটি গ্রামের নিখিল রায়ের ছেলে ও বাদাঘাট সরকারি ডিগ্রি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র প্রিন্স রায় দ্বীপ্ত (২২) তার ফেসবুক আইডি থেকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে কটূক্তিমূলক পোস্ট ও মন্তব্য করে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। উত্তেজিত ছাত্র-জনতা অভিযুক্তের ফাঁসির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভা করে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাহিরপুর থানা পুলিশ বাদাঘাট বাজার থেকে অভিযুক্ত দ্বীপ্ত রায়কে আটক করে। পরবর্তীতে বুধবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে পেনাল কোড ২৯৫ ধারা এবং সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৬ ধারায় মামলা দায়ের করে। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে আদালত তাকে জেলহাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
অভিযুক্ত দ্বীপ্ত রায় আটক ও আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকার পরও, গত বুধবার রাতে একদল উত্তেজিত জনতা গড়কাটি গ্রামে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসতবাড়ি ও একটি মন্দিরে আকস্মিক হামলা চালায়। এ সময় বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ও মন্দিরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যার ফলে স্থানীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
আজ শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত গড়কাটি গ্রাম পরিদর্শনে যান স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর ও মন্দির ঘুরে দেখেন এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সান্ত্বনা দেন।
পরিদর্শন শেষে স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এমপি কামরুল বলেন, অপরাধী যে-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। কিন্তু একজনের অপরাধের দায় পুরো সম্প্রদায়ের ওপর চাপিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং নিরীহ মানুষের ঘরবাড়িতে হামলা চালানো কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রশাসন এ ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
সভায় সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার জাকির হোসেন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিক স্থানীয়দের নিরাপত্তার পূর্ণ আশ্বাস দেন এবং যেকোনো মূল্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংখ্যালঘু পল্লী পরিদর্শনের পর সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বাদাঘাট বাজার জামে মসজিদের সামনে স্থানীয় আলেম, ধর্মীয় নেতা ও ইমামদের সঙ্গে এক জরুরি সভায় মিলিত হন। সভায় বক্তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট থেকে বিরত থাকার এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারীদের বিরুদ্ধে আইনি উপায়ে মোকাবিলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে কোনো কুচক্রী মহল যাতে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ করা হয়।
পরিদর্শন ও মতবিনিময় সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের আহ্বায়ক অশোক তালুকদার, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক বাদল মিয়া, যুগ্ম আহ্বায়ক জুনাব আলী, মেহেদী হাসান উজ্জ্বলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
প্রীতম দাস/ সজল আহমদ
মন্তব্য করুন: