শাল্লায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বাড়ি ও দোকানে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় পূর্বশত্রুতার জেরে এক মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বাড়ি ও দোকানে সংঘবদ্ধ হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় গর্ভবতী নারীসহ পরিবারের তিন নারী আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে এক নারী ও তাঁর ১১ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণচেষ্টার গুরুতর অভিযোগও করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা। হামলায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার মালামাল লুট ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি পরিবারের। ঘটনার পর থেকে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে পরিবারটি। তাদের দাবি, দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
গত ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে শাল্লা উপজেলার ১ নম্বর আটগাঁও ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দৌলতপুর গ্রামে দুলাল মিয়ার বাড়ি ও দোকানে এ হামলার ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, একই গ্রামের জালাল মিয়া, তোফাজ্জল মিয়া, শাহিন মিয়া, হেকিম মড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামিম, নূর ইসলামসহ আরও কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে তাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালান। এ সময় বাড়িঘর ভাঙচুর, আসবাবপত্র তছনছ এবং ঘরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা বাড়ি থেকে ছয়টি গরু, পাঁচটি ফ্রিজ, দুটি আইপিএস, দুটি ব্যাটারি, একটি এলইডি টেলিভিশন, সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়ে যায়। পাশাপাশি দোকানের প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল লুট করা হয়েছে। সব মিলিয়ে লুট ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০ লাখ টাকা বলে দাবি করেছেন তারা।
হামলায় আহত ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে দিরাই ও শাল্লা হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারী রয়েছেন।
আহত ফাতেমা বেগম বলেন, আমরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের মানুষ। আমার স্বামী দুলাল মিয়া যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী। এ কারণে অভিযুক্ত প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে আসছে। বৃহস্পতিবার রাতে তারা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের বাড়ি ও দোকানে হামলা চালায়। বাধা দিতে গেলে আমার ওপরও হামলা করা হয়।
ফাতেমা বেগমের মেয়ে উজ্জলা বেগম অভিযোগ করে বলেন, হঠাৎ করে তারা আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। জালাল মিয়ার নির্দেশে আমাদের ঘর থেকে সাড়ে পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার, সাড়ে চার লাখ টাকা ও ছয়টি গরুসহ যাবতীয় মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ সময় আমার ওপরও হামলা করা হয়। আমার শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেওয়া এবং আমাকে ও আমার ১১ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। তখন আমি আমার দুটি আংটি ও একটি চেইন দিয়ে তাদের হাত পায়ে ধরে অনুনয় করে রক্ষা পাই।
তিনি আরও বলেন, আমরা যুদ্ধাপরাধের মামলার সাক্ষী ও বীরাঙ্গনা পরিবারের সদস্য। এ কারণে দুর্বৃত্তরা আমাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে চায়। ঘটনার পর থেকে আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।
উজ্জলা বেগমের স্বামী হেলাল মিয়া বলেন, হামলার খবর পেয়ে আমি সুনামগঞ্জ থেকে দৌলতপুরে আসি। এসে দেখি, আমাদের দোকান ও বাড়ির সব মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে। ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ মানুষ ছিলেন না। দুর্বৃত্তরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুর, আসবাবপত্র লুটপাটসহ ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে। বাড়ির নারীদের শ্লীলতাহানিরও চেষ্টা চালিয়েছে। আমরা এ দুর্বৃত্তদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত জালাল মিয়ার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে শাল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল বলেন, ঘটনার খবর জানতে পেরে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বাড়িতে হামলা, লুটপাট এবং নারী ও শিশুর প্রতি যৌন নিপীড়নের অভিযোগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধের মামলায় সাক্ষী হওয়ার কারণে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
পরিবারটির দাবি, শুধু অভিযোগ গ্রহণ নয়, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, লুট হওয়া মালামাল উদ্ধারের উদ্যোগ, আহতদের চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নারী ও শিশুর প্রতি সংঘটিত অপরাধের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। পাশাপাশি অভিযোগে যাদের নাম এসেছে, তদন্তে সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রীতম দাস/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: