শাহজালাল মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে দ্বিমুখী বিতর্ক

বংশ পরম্পরা নাকি সরকারি ওয়াকফ?

শাহজালাল মাজারের আয়-ব্যয় নিয়ে দ্বিমুখী বিতর্ক

তাহির আহমদ

২৫/০৬/২০২৬ ২৩:১১:৫৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেটের ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সুপরিচিত হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে দান হিসেবে আসা বিপুল অর্থ নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা দানের এই অর্থ আসলে কোথায় যায়—তা এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।


সিলেটের সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের একটি ‘ম্যাজিক্যাল’ উদ্যোগের পর টনক নড়েছে সরকার সংশ্লিষ্টদেরও। মাজারের দানবাক্সে তালা লাগিয়ে আলোচনায় আসা এই কর্মকর্তার প্রশংসা করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছেন, “তিনি আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতে সরকার কাজ করবে।”


উল্লেখ্য, তালা লাগানোর দুইদিন পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে সারওয়ার আলমকে সিলেট থেকে প্রত্যাহার করা হয়। এর জের ধরে গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) তিনি নতুন দায়িত্ব বুঝে নিতে সিলেট ত্যাগ করেন। তবে তার বদলির রেশ এখনও কাটেনি। প্রতিদিনই বিভিন্ন সংগঠন জেলা প্রশাসককে সিলেটে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে।


সিলেটের জেলা প্রশাসন থেকে মাজারে আসা টাকাসহ বিভিন্ন ধরনের দানের সুনির্দিষ্ট হিসেব না রাখা এবং আয়-ব্যয়ের সন্তোষজনক ব্যাখ্যা না থাকার অভিযোগ তোলার পর বিষয়টি সামনে আসে।


গত ১৮ জুন (বৃহস্পতিবার) জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দানের জন্য ব্যবহৃত তিনটি বড় ডেগ বা পাতিল সিলগালা করা হয়, যাতে ভেতরের টাকা কেউ বের করতে না পারে। একই সাথে বসানো হয় একটি নতুন দানবাক্স। এরপর গত ২২ জুন (সোমবার) মাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দানের ডেগ ও দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে টাকা গণনার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। মাত্র চার দিনের ব্যবধানে সেখানে পাওয়া যায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা, কিছু বৈদেশিক মুদ্রা এবং স্বর্ণালংকার। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওয়ার পর মাজারে আসলে প্রতি মাসে কী পরিমাণ টাকা আসে, তা নিয়ে আলোচনা আরও জোরদার হয়েছে।

প্রশাসনের অভিযোগ বনাম খাদেমদের দাবি


এর আগে গত শুক্রবার মাজার পরিদর্শন করে বিদায়ী জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম অভিযোগ করেছিলেন, কিছু ব্যক্তি মাজারের আয় নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খরচ করেন। এই ঘটনার পর সম্প্রতি একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন। এখন থেকে মাজারের টাকা ওই ব্যাংক হিসেবে রাখা হবে। এছাড়া আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে ওয়াকফ এস্টেট ও মাজার কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করবে।


তবে মাজার ব্যবস্থাপনায় থাকা খাদেমরা প্রশাসনের এই হস্তক্ষেপ মানতে নারাজ। শাহজালাল মাজারের একজন খাদেম মুফতি রায়হান উদ্দিন মুন্না বলেন, সাতশ বছর ধরে বংশ পরম্পরায় আমরা মাজারের খাদেমের দায়িত্ব পালন করছি। হযরত শাহজালালের সাথে আসা সঙ্গীদের পরিবারের উত্তরাধিকার আমরা। এই দরগা কোনো রাষ্ট্রীয় সম্পদ নয়। মাজারের দান এখানকার মেহমানদের সেবা আর ব্যবস্থাপনাতেই ব্যয় হয়।


প্রচলিত আছে, হযরত শাহজালাল (রহ.) অবিবাহিত হলেও তাঁর সঙ্গীরা পরিবারসহ সিলেটে বাস করতেন। তৎকালীন সময়ে ভক্তদের দেওয়া উপঢৌকন শাহজালাল (রহ.) এই পরিবারগুলোর মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। বর্তমানে এই বংশের প্রায় ৩০০টি পরিবার রয়েছে এবং প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী একেকটি পরিবার একেক দিন মাজার পরিচালনার দায়িত্বে থাকে।


মাজারের আইনি মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ওয়াকফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ স্পষ্ট জানিয়েছেন, শাহজালাল (রহ.) মাজার একটি তালিকাভুক্ত ওয়াক্ফ সম্পত্তি।


তিনি বলেন, “বাংলাদেশে যত মাজার, ঈদগাহ, কবরস্থান ও মসজিদ আছে, সবই 'বাই ডিফল্ট' ওয়াক্ফ। ১৯১৩ সালের আইন অনুযায়ী এগুলো ওয়াক্ফ হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করা বাধ্যতামূলক।” তিনি আরও জানান, শাহজালালের মাজারটি ওয়াকফের তিনটি ক্যাটাগরি—'ওয়াকফ ফি লিল্লাহ' (আল্লাহর উদ্দেশ্যে দান), 'ওয়াক্ফ আলাল আওলাদ' (উত্তরাধিকারীদের জন্য অংশ রাখা) এবং 'ব্যবহারিক ওয়াকফ'—সবগুলোর মধ্যেই পরিগণিত হয়।


এদিকে বুধবার চারদিনের সফরে সিলেট এসে পৌঁছালে এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। মাজার ইস্যু ও ডিসির প্রত্যাহার প্রসঙ্গে তিনি সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানান।


মন্ত্রী বলেন, উনি (সারওয়ার আলম) আমাদের চোখ খুলে দিয়েছেন। আমরা সেদিকেই জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করব। এ ধরণের স্বচ্ছতার পদক্ষেপে আমাদের সহযোগিতা করা প্রয়োজন। মাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।


তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথেও তাঁর আলাপ হয়েছে এবং সরকার দ্রুতই মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে।


জেলা প্রশাসকের আকস্মিক বদলি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, "বদলির বিষয়টা একটি রুটিন ওয়ার্ক। এটা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তবে কাকতালীয়ভাবে এটি এই ঘটনার সাথে সংযুক্ত হয়ে গেছে।"


মীর্জা ইকবাল/ তাহির আহমদ

মন্তব্য করুন: