মনোনয়নকেন্দ্রিক কোন্দলে উত্তপ্ত সুনামগঞ্জ বিএনপি

বিদ্রোহের আশঙ্কা

মনোনয়নকেন্দ্রিক কোন্দলে উত্তপ্ত সুনামগঞ্জ বিএনপি

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

২৫/১১/২০২৫ ১২:২৯:১৮

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণার পর থেকেই সুনামগঞ্জজুড়ে শুরু হয়েছে নির্বাচনী উত্তাপ। বিশেষ করে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পর পাঁচটি আসনের মধ্যে তিনটিতে প্রকাশ্যেই বিস্তর কোন্দল, অসন্তোষ ও বিভাজন সামনে এসেছে। মনোনয়ন পাওয়া এবং বঞ্চিত প্রার্থীদের সমাবেশ, শোডাউন ও লবিং এখন জেলার রাজনীতির মূল আলোচ্য বিষয়।

দলীয় সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় বিএনপি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। জেলা থেকে ইউনিয়ন—প্রতিটি পর্যায়ে বলয়ভিত্তিক প্রভাবশালী নেতাদের উত্থান মনোনয়নকে ঘিরে তৈরি করেছে দ্বিধা-বিভক্ত অবস্থা। ফলে প্রাথমিক তালিকা ঘোষণার পরও তৃণমূলে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।

সুনামগঞ্জ-১: মনোনীত প্রার্থীর বিপরীতে পৃথক সমাবেশ


তাহিরপুর–জামালগঞ্জ–ধর্মপাশা–মধ্যনগর নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-১ আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষকদলের সহ-সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আনিসুল হক। মনোনয়ন মিলতেই মাঠে নেমেছেন তিনি। অন্যদিকে সমর্থন না জানিয়ে পৃথকভাবে সমাবেশ ও শোডাউন করছেন জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান কামরুল এবং যুবদলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুবুর রহমান। দুইজনই চূড়ান্ত মনোনয়নের আশায় হাইকমান্ডে লবিং জোরদার করেছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—এই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

সুনামগঞ্জ-২: জোটের জন্য ছাড় নাকি দলীয় প্রার্থী?


দিরাই–শাল্লা নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-২ আসনে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি বিএনপি। গুঞ্জন রয়েছে—এটি জোটের জন্য ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। যদিও বিএনপির চার সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচন উপলক্ষে সক্রিয়ভাবে মাঠে রয়েছেন নাছির উদ্দীন চৌধুরী, অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল, সাবেক এমপি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী রুমি, যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতা আজমল হোসেন চৌধুরী জাবেদ। এ আসনেও বিদ্রোহী প্রার্থীর শঙ্কা প্রবল।

সুনামগঞ্জ-৩: ঘোষণার আগেই বিদ্রোহী অবস্থান


শান্তিগঞ্জ–জগন্নাথপুর আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমদ।ঘোষণা হতেই জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ান হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম ঘোষণা করেন। অন্যদিকে মনোনয়ন প্রত্যাশী নাদীর আহমদ চূড়ান্ত তালিকা না আসা পর্যন্ত পৃথক প্রচারে ব্যস্ত। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা এখানে সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে।

সুনামগঞ্জ-৪: প্রার্থীহীন ঘোষণায় অস্থিরতা চরমে


সদর–বিশ্বম্ভরপুর নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৪ আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। এ কারণে মনোনয়ন প্রত্যাশী পাঁচজন নেতার মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা— দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন, অ্যাডভোকেট আব্দুল হক, অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুল, ব্যারিস্টার আবিদুল হক আবিদ, আবুল মনসুর শওকত। দলীয় কোন্দল এতটাই প্রকট যে—মনোনয়ন বঞ্চিতদের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে পারেন বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা।

সুনামগঞ্জ-৫: মিলন বনাম মিজান সমর্থকদের দ্বন্দ্ব


ছাতক–দোয়ারাবাজার আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছেন তিনবারের সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন। কিন্তু ক্ষোভে ফুঁসছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীর সমর্থকরা। মিলনের মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও শোডাউন হয়েছে একাধিকবার। মিজান সরাসরি বিদ্রোহী হবেন কিনা না বললেও তার অনুসারীরা মনে করছেন—তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। এদিকে মিলন জানিয়েছেন—দলের স্বার্থেই সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে এবং মান-অভিমান ভুলে মিজানকে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।


জেলার পাঁচটি আসনের চারটিতেই মনোনয়নসংক্রান্ত বিরোধ চরমে। প্রাথমিক তালিকা ঘোষণার পাঁচ সপ্তাহ পার হলেও মাঠের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অনাস্থা, নিজস্ব বলয় ধরে রাখার প্রবণতা এবং দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা—এসব মিলিয়ে সুনামগঞ্জ বিএনপি এখন সবচেয়ে অস্থির সময় পার করছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিভক্তি যদি চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পরও কমে না, তবে জেলার আসনগুলোতে বিএনপি গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।

এ রহমান

মন্তব্য করুন: