শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত সুনামগঞ্জের ৩ হাজার শিশু

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত সুনামগঞ্জের ৩ হাজার শিশু

নিজস্ব প্রতিনিধি,সুনামগঞ্জ

০৪/১১/২০২৬ ১৪:২৬:২১

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মুখ দেখেনি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ১৩টি গ্রাম। ছয় ইউনিয়নের এসব গ্রামের প্রায় তিন হাজার শিশু নিয়মিত প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। বিদ্যালয় না থাকায় অনেকের শৈশব কাটছে কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও শ্রমে। দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের দুর্ভোগে ঝরে পড়ছে অনেকে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে বারবার আবেদন করেও প্রতিকার না পাওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে অভিভাবকদের।

উপজেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, বিদ্যালয়বিহীন ১৩টি গ্রামে জনসংখ্যা ৯ হাজার ৩৮। পরিবার রয়েছে ১ হাজার ৬৭৪টি।

বিদ্যালয়বিহীন গ্রামগুলোর মধ্যে জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের মমিনপুর, উত্তর লক্ষ্মীপুর, হোসেনপুর, ইনসানপুর, ঝুনুপুর, মাছুমপুর, মুসলিমপুর ও সদরকান্দি; ফেনারবাঁক ইউনিয়নের রসুলপুর ও যশমন্তপুর; সাচনা বাজার ইউনিয়নের নজাতপুর ও নূরপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প এবং ভীমখালী ইউনিয়নের চান্দেনগর রয়েছে।

এসব গ্রামের অনেক শিশু মসজিদের মক্তবে প্রাথমিক পাঠ নিলেও নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। বাড়ি থেকে দূরের বিদ্যালয়ে যাতায়াতের পথ দুর্গম হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ফলে অনেক শিশু একপর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে পরিবারের কাজে যুক্ত হচ্ছে। কেউ কৃষিকাজ করছে, কেউ হাওরে মাছ ধরছে, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে শ্রম দিচ্ছে।

নজাতপুর গ্রামের ১১ বছর বয়সী জাহিদেরও পড়াশোনার স্বপ্ন আছে। কিন্তু বিদ্যালয় না থাকায় সেই স্বপ্ন অনিশ্চিত। বাবা তাকে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাড়ির কাজে যুক্ত হতে বলেছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জাহিদ বলে, ‘আমি কাজ করতে চাই না, মাস্টার হতে চাই।’

বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কাছে বহুবার আবেদন জানিয়েছেন অভিভাবকেরা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে তাদের। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর আর কেউ খোঁজ নেন না।

মমিনপুর গ্রামের কাদির মিয়া বলেন, ‘আমাদের গ্রামে শত শত শিশু পড়তে চায়, কিন্তু স্কুল নেই। আমরা হয়তো মরে যাব, কিন্তু স্কুল দেখে যেতে পারব না।’

মমিনপুরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি দখলের অভিযোগে তা বাস্তবায়িত হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০০০ সালে গ্রামবাসী ৩৩ শতক জমি কিনে ‘মমিনপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ নামে নামজারি করেন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে জমিটি দখলে রেখেছেন। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তারা।

শুধু বিদ্যালয়ের জমি নয়, আগে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এখন কার্যক্রমহীন। স্থানীয়দের ভাষ্য, বেসরকারি সংস্থা এফআইডিভির উদ্যোগে একসময় জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নে তিনটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সেগুলোর কার্যক্রম বন্ধ। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্যালয়গুলোর ভবন দখল করে কেউ কেউ বসতি গড়েছেন। ফলে অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না শিশুরা।

লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলেন, বিদ্যালয়বিহীন গ্রামগুলোয় প্রতি ৩০০ শিশুর জন্য অন্তত একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রয়োজন। দূরত্ব ও যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এসব গ্রামের শিশুরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না।

জামালগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পীযূষ কান্তি মজুমদার বলেন, মমিনপুরে বিদ্যালয়ের নামে জমি রয়েছে। ২০২৫ সালে সরেজমিন পরিদর্শন করে ১২টি বিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সরকারি কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে প্রাথমিক শিক্ষার বিকল্প নেই। বিদ্যালয়বিহীন গ্রাম থাকা দুঃখজনক।

রত্না বাউরী/প্রসি-২৬

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad