নেপথ্যে ঠিকাদার-সাব টিকাদারের দ্বন্দ্ব
সুনামগঞ্জে এমপির বিরুদ্ধে কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ!
সুনামগঞ্জ-কাচিরগাতি-বিশ্বম্ভরপুর সড়কে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীনে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ টাকার একটি নির্মাণ ও সংস্কার কাজ চলছে। সওজ সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, সেতু ও কালভার্ট পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় এই সড়কের লালপুর-সালামপুর সেতু (১ ও ২) এবং ৫ কিলোমিটার সড়কের সংস্কার ও গার্ডওয়াল নির্মাণের কাজ পান 'ইসলাম কন্সট্রাকশন'-এর ঠিকাদার বদরুল ইকবাল।
গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগপন্থী ঠিকাদার বদরুল ইকবাল দেশত্যাগ করেন। ওই সময় তাহিরপুর উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন ২০ কোটি টাকায় কাজটি কিনে নেন। বদরুলের সাথে করা চুক্তির সময় বর্তমান সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম সাক্ষী ছিলেন। পরবর্তীতে আজাদ ও শফিকুল যৌথভাবে কাজ শুরু করলেও একপর্যায়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, নানা কৌশলে আজাদ হোসেনকে বিতাড়িত করে পুরো কাজের নিয়ন্ত্রণ নেন শফিকুল ইসলাম এবং এ ঘটনায় আজাদকে জেলেও যেতে হয়। বর্তমানে এই সাব-ঠিকাদারের অধীনেই কাজটি চলমান রয়েছে।
সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর সড়কের লালপুর এলাকার সেতু সংযোগ সড়ক প্রশস্তকরণ, গার্ডওয়াল নির্মাণ ও ব্লক স্থাপনের কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেন স্থানীয় এলাকাবাসী। এর প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সরেজমিনে গিয়ে নির্মাণকাজে অনিয়ম দেখতে পেয়ে ঠিকাদারকে ভর্ৎসনা করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। একই সাথে তিনি সড়ক বিভাগকে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন এবং পরদিন প্রকৌশলী ও সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে উপস্থিত থাকার কথা বলেন।
এদিকে নির্মাণকাজ পরিদর্শনের ঘণ্টা না পেরোতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ তোলেন সাব-ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। রাতেই বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়।
পরদিন বুধবার দুপুরে সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী, দলীয় নেতাকর্মী ও এলাকাবাসীকে নিয়ে পুনরায় নির্মাণকাজে এলাকা পরিদর্শনে যান সংসদ সদস্য।
এ সময় তিনি বলেন, "একটি অনুষ্ঠান থেকে যাওয়ার পথে এলাকাবাসী সড়ক নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেন। আমি দেখতে পাই, সদ্য নির্মিত গার্ডওয়াল একদিকে হেলে পড়েছে এবং ব্লক নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। মাটি কমপেকশন না করে জিও টেক্সটের ওপর নিম্নমানের ব্লক বসানো হচ্ছে এবং ভিট বালুর পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে কৃষি জমির টপ সয়েল।"
এমপি আরও বলেন, "এটি হাওরের চারটি উপজেলার মানুষের চলাচলের একমাত্র সড়ক। নির্মাণে অনিয়মের কারণে এটি ধসে পড়লে জনগণের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হবে। এ জন্যই আমি কাজ বন্ধ করতে এবং অনিয়ম তদন্ত করতে বলেছি। কিন্তু এর পরই আমার বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদার মিথ্যা অভিযোগ তোলা হয়েছে। তারা যদি মনে করে স্কেন্ডাল রটিয়ে আমাকে জনগণের পক্ষে কথা বলা থেকে দমানো যাবে, তবে তা ভুল ধারণা। আমার এলাকায় চাঁদাবাজির কোনো নজির নেই। তারা চাঁদা দাবির বিষয়টি প্রমাণ করুক, আমি শাস্তি মাথা পেতে নেব। তবে কাজের অনিয়মের সাথে জড়িতদেরও শাস্তি পেতে হবে।"
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা সরকারে এসেছি মাত্র ৮ মাস হলো। এর আগে তো ঠিকাদাররা কখনো চাঁদাবাজির অভিযোগ করেননি। এখন অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেই এই অপপ্রচার শুরু হয়েছে।" এ সময় তিনি সওজ বিভাগকে কাজের গুণগত মান কঠোরভাবে পরীক্ষা করে শতভাগ মান নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, "অভিযোগগুলো আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও ডিজাইন ইউনিটকে লিখিতভাবে অবহিত করব এবং প্রাপ্ত নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। মাটির অতিরিক্ত চাপের কারণে গার্ডওয়াল কিছুটা হেলে গেছে, বিষয়টি সত্য। আমরা ঠিকাদারকে বারবার সতর্ক করেছি। এই কাজের ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪৩ শতাংশ বিল উত্তোলন করা হয়েছে। উন্নত উপাদানের মাধ্যমে শতভাগ কাজ করাতে আমাদের মনিটরিং কঠোর থাকবে।"
অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল ঠিকাদার বদরুল ইকবাল দেশত্যাগের পর ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ২০ কোটি টাকায় কাজটি কিনে নেন। এই চুক্তিতে ১ নম্বর সাক্ষী ছিলেন শফিকুল ইসলাম। বর্তমানে শফিকুল নানা কৌশলে আজাদকে সরিয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন। তিনি এই ঘটনার যথাযথ প্রতিকার দাবি করেছেন।
লতিফুর রহমান রাজু/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: