সিলেট বিভাগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে ৫৪ শতাংশ পদ শূন্য, ব্যাহত সেবা ও উন্নয়ন
সিলেট বিভাগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি শূন্য থাকায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, খামার ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। এতে গৃহস্থালি পর্যায়ে পশুপালনকারী পরিবার থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক খামারিরাও সময়মতো সরকারি সেবা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত ৭৪৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩৪২ জন। শূন্য রয়েছে ৪০৫টি পদ, যা মোট অনুমোদিত পদের প্রায় ৫৪ দশমিক ২২ শতাংশ। বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দপ্তরগুলোর পৃথক হিসাবেও এই জনবল সংকটের বড় চিত্র উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নথি অনুযায়ী, এসব পর্যায়ে অনুমোদিত ৪৯৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৩২ জন; অর্থাৎ শূন্য পদের সংখ্যা ২৬৫টি।
সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস বলেন, নথিতে কর্মরত জনবলের যে হিসাব রয়েছে, মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কর্মীর সংখ্যা তার চেয়েও কম। বিভিন্ন কারণে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী সংশ্লিষ্ট কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বাইরে অন্যত্র সংযুক্ত আছেন। ফলে জনবল সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলা ভেটেরিনারি হাসপাতালগুলোতে অনুমোদিত ২৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৩ জন (শূন্য ১৫টি)। জেলা দুগ্ধ খামারে ৪৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৫ জন (শূন্য ৩২টি)। সরকারি ছাগল উন্নয়ন খামারে অনুমোদিত ১২টি পদের মধ্যে পূরণ হয়েছে ছয়টি এবং সরকারি মুরগি খামারে ২১টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৩ জন (শূন্য আটটি)। হাঁস প্রজনন হ্যাচারিতে ১৪টির মধ্যে শূন্য আটটি এবং জেলাভিত্তিক কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্রগুলোতে ২৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ১৬ জন (শূন্য ১৩টি)। এ ছাড়া এফডিআইএল, এলটিআই ও প্রাণিসম্পদ কোয়ারেন্টাইন স্টেশনগুলোতে যথাক্রমে ১১, ২৯ ও ৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে শূন্য রয়েছে যথাক্রমে পাঁচ, ২৮ ও ১২টি পদ।
পদ শুন্যতায় সিলেট বিভাগের চার জেলা—সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে প্রাণিসম্পদ খাত গ্রামীণ অর্থনীতি ও পুষ্টিচাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি, অসুস্থ পশু-পাখির চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের গৃহস্থ আব্দুর রহিম বলেন, বাড়িতে গরু পালন করি। অসুখ-বিসুখ হলে পাশের গ্রামের একজন চিকিৎসককে দেখাই, জরুরি অবস্থায় অনেক সময় তাঁকে পাওয়া যায় না। উপজেলা সদর থেকে মাঝেমধ্যে চিকিৎসক আসেন টিকা দেওয়ার জন্য, তবে তিনি সরকারি নাকি বেসরকারি, তা জানি না।
দিরাই উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মিঠুন চন্দ্র বলেন, আমার এলাকায় ১১ জন লোক প্রয়োজন। অথচ দুর্গম হাওর অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও মাত্র তিনজনকে দিয়ে কাজ সামলাতে হচ্ছে। জীবিকার তাগিদে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
দিরাইয়ের সাবেক হাঁস ও ডিম উৎপাদক রথীন্দ্র বৈষ্ণব জানান, সংক্রামক রোগ দেখা দিলে দ্রুত সেবা ও ওষুধ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে তাঁর খামারটি বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
সিলেট বিভাগীয় ডেপুটি চিফ এপিডেমিওলজিস্ট ডা. মোহাম্মদ আবদুল কাহির জানান, হাওর, পাহাড় ও টিলাবেষ্টিত এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে সেবা পৌঁছানো এমনিতেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্ষা মৌসুমে হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হলে মাঠপর্যায়ে চিকিৎসা ও তদারকি কার্যক্রম আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি জানান, বিভাগে বর্তমানে মোট ৮০৫টি বেসরকারি খামার রয়েছে। এর বিপরীতে সরকারি খামার রয়েছে মাত্র তিনটি। মাঠপর্যায়ের সার্বিক কাজের তুলনায় তাঁদের সক্ষমতা খুবই সীমিত।
সিলেট সদর উপজেলার সাহেববাজার এলাকার ‘অয়েস্টার পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিশারিজ লিমিটেড’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইমরান হোসাইন বলেন, “সিলেটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে। যাঁরা এখানে আসেন, তাঁদের অনেকেই স্থায়ীভাবে থাকতে চান না। অনেক খামারের নিবন্ধনও নেই। সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও পরিকল্পনার সঙ্গে খামারিদের যোগাযোগ বাড়াতে হবে।”
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিম্যাল অ্যান্ড ফিশ বায়োটেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, “সিলেটের মানুষ ডেইরি সেক্টরে আগের চেয়ে বেশি উদ্যোগী হলেও লোকবল কম থাকায় খামারিদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং তরুণ উদ্যোক্তারা আশাহত হন। আধুনিক রোগ নির্ণয়ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত টিকা ও ওষুধ সরবরাহ এবং খামারিদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে।”
তাঁর মতে, শূন্য পদ পূরণ করে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা গেলে এবং জনবল কাঠামোতে বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী পদায়ন করা গেলে সিলেট অঞ্চলের প্রাণিসম্পদ খাতের সেবার মান ও উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: