সিলেটের সেই জয়ন্তের ‘প্রভাষক’ পরিচয়ে খাতা দেখার নেপথ্যে জালিয়াতি

কাগজে পদ বদল, বাস্তবে অফিস সহকারী:

সিলেটের সেই জয়ন্তের ‘প্রভাষক’ পরিচয়ে খাতা দেখার নেপথ্যে জালিয়াতি

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

১১/০৮/২০২৬ ১৪:২৭:২৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেট নগরের শিবগঞ্জ এলাকার গ্রিনহিল স্টেট কলেজের অফিস সহকারী জয়ন্ত দত্তকে ঘিরে জালিয়াতি ও ভুয়া পরিচয়ের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্রের খাতা মূল্যায়ন করে গণমাধ্যমের শিরোনাম হওয়ার পর, তদন্তে নেমে তার পদে পদে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে তদন্ত কমিটি।

স্বঘোষিত ‘প্রভাষক’ জয়ন্ত দত্ত কলেজে মূলত অফিস সহকারী হিসেবে কর্মরত থাকলেও বিভিন্ন নথিপত্রে তাকে ভিন্ন ভিন্ন পদে উপস্থাপন করা হয়েছে। গত সোমবার (১০ আগস্ট) তদন্ত কমিটি কলেজে সরেজমিনে গিয়ে নথিপত্র যাচাই করে দেখতে পায়—কোনো রেজিস্টারে তাকে ‘প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ আবার কোথাও ‘হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা’ দেখানো হয়েছে। অথচ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক কর্মকর্তা নামে কোনো পদের অস্তিত্বই নেই। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি করা হয়েছে শিক্ষা বোর্ডের কাছে, যেখানে তাকে নিয়মিত ‘প্রভাষক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তবে এসব পদের একটিরও বৈধ নিয়োগপত্র দেখাতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ বা জয়ন্ত নিজে।

তদন্ত কমিটির প্রধান ও শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক আবু মো. মূসা তারেক জানান, জয়ন্ত দত্ত এবং কলেজের অধ্যক্ষ বোর্ডকে অসত্য তথ্য দিয়েছেন। জয়ন্ত মূলত ২০১২ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানের অফিস সহকারী। ২০২২ সালে পরীক্ষক নিয়োগের সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সিতেশ রঞ্জন বর্মন তাকে বাংলা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে ভুয়া প্রত্যয়নপত্র দেন, যার ভিত্তিতে তিনি পরীক্ষক হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। বোর্ডের জিজ্ঞাসাবাদে অধ্যক্ষ প্রয়াত এক সাবেক অধ্যক্ষের স্বাক্ষরযুক্ত একটি ভুয়া নিয়োগপত্রও উপস্থাপন করেছিলেন, কিন্তু সন্দেহের মুখে পরে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান।

অধ্যক্ষের দেওয়া ভুয়া প্রত্যয়নপত্রের জোরে জয়ন্ত দত্ত টানা পাঁচ বছর ধরে এইচএসসির উত্তরপত্র মূল্যায়ন করে আসছেন। চলতি বছরও তিনি বাংলা প্রথমপত্রের ৫৫৪টি খাতা মূল্যায়ন করে বোর্ডে জমা দিয়েছেন। অথচ বোর্ড নির্দেশিকা অনুযায়ী, কলেজ পর্যায়ে পরীক্ষক হতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক। ২০০৮ সালে পাস কোর্সে ডিগ্রি সম্পন্ন করা জয়ন্ত ২০১৯ সালে বাংলায় স্নাতকোত্তর করেন। বিষয়ভিত্তিক স্নাতক না থাকা এবং কোনো প্রকার প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি বছরের পর বছর এই দায়িত্ব সামলেছেন।

ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর সিলেট শিক্ষা বোর্ড কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জয়ন্তকে বরখাস্তের কথা জানান এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে এতে সন্তুষ্ট না হয়ে বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীনের নির্দেশে ৩ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যাদের তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

নিজের ভুল স্বীকার করে অভিযুক্ত জয়ন্ত দত্ত জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক সংকট থাকায় তিনি ক্লাস নেওয়া শুরু করেছিলেন। তবে শিক্ষক না হয়েও পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন করা এবং কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়া এই দায়িত্ব নেওয়া তার বড় ভুল হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন। বোর্ড কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad