আইনি লড়াই শেষে বড়লেখায় ৫ বছর পর শপথ নিলেন ইউপি সদস্য
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদে নির্বাচনের ফল নিয়ে প্রায় পাঁচ বছর ধরে আইনি লড়াই চলেছে। শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে বিজয়ী ঘোষিত হওয়ার পর শপথ নিয়েছেন রশিদ আহমদ সোনাম। নির্বাচনের প্রায় ৪ বছর ৯ মাস পর ইউপি সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিলেন তিনি।
মঙ্গলবার (১১ আগষ্ট) সকালে বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব তাকে শপথ পড়ান। এ সময় উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈমা নাদিয়া, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাওলাদার আজিজুল ইসলামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
মামলার নথি ও স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পদে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন রশিদ আহমদ সোনাম। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন খছরুজ্জামান। তিনি মোরগ প্রতীকে নির্বাচন করেন।
ভোট গ্রহণ ও গণনা শেষে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খছরুজ্জামানকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। তবে ভোট গণনায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে রশিদ আহমদ সোনামের নির্বাচনী এজেন্ট আপত্তি জানান। তার অভিযোগ, সেই আপত্তি আমলে না নিয়ে দ্রুত ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
এরপর ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে প্রথমে নির্বাচন কার্যালয়ে ভোট পুনর্গণনার আবেদন করেন রশিদ আহমদ সোনাম। পরে মৌলভীবাজারের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল ভোট পুনর্গণনা করে রশিদ আহমদ সোনামকে বিজয়ী ঘোষণা করেন।
ট্রাইব্যুনালের এই রায়ের বিরুদ্ধে খছরুজ্জামান নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করেন। তবে তার আপিল খারিজ হয়ে যায়। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল থাকে।
এরপর ২০২৫ সালের ২২ জুন বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন রশিদ আহমদ সোনামকে বিজয়ী ঘোষণা করে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। পরে খছরুজ্জামান ট্রাইব্যুনালের রায় স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট তিন মাসের জন্য রায় স্থগিত করেন।
এ অবস্থায় রশিদ আহমদ সোনাম সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল করেন। আপিল বিভাগের নির্দেশনার পর গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ খছরুজ্জামানের করা রিট (৮৯১৯/২০২৫) খারিজ করে দেন।
একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে আগের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্বাচন কমিশনকেও নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের ওই রায়ের পর রশিদ আহমদ সোনাম গত ২৭ জুলাই বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ২ আগস্ট মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করেন। পরে জেলা প্রশাসনের আইনগত মতামতের ভিত্তিতে ১১ আগস্ট তার শপথ গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
শপথ নেওয়ার পর রশিদ আহমদ সোনাম বলেন, ‘২০২১ সালের নির্বাচনে আমি প্রকৃত বিজয়ী ছিলাম। অনৈতিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে কারচুপির মাধ্যমে আমাকে ভোটে পরাজিত দেখানো হয়েছিল। আদালতের রায়ে আমি ন্যায়বিচার পেয়েছি। সত্যের বিজয় হয়েছে।’
ইউএনও মাহবুব আলম মাহবুব বলেন, ‘আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে রশিদ আহমদ সোনামকে শপথ পড়ানো হয়েছে। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।’
হাইকোর্টে রশিদ আহমদ সোনামের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ শুনানি শেষে হাইকোর্টের রায়ে আমার মক্কেল ন্যায়বিচার পেয়েছেন। প্রায় ৪ বছর ৯ মাস পর শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি তার দায়িত্ব গ্রহণ করলেন।’
মৌলভীবাজার আদালতে রশিদ আহমদ সোনামের পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট আব্দুল মতিন।
হিফজুর রহমান / নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: