সিলেটে বিশেষ শিশুদের স্কুলে চার শিক্ষকের 'স্বেচ্ছাচারিতা'

ক্ষোভ অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের

সিলেটে বিশেষ শিশুদের স্কুলে চার শিক্ষকের 'স্বেচ্ছাচারিতা'

প্রথম সিলেট প্রতিবেদন

০৯/০৮/২০২৬ ১৯:৩৯:৪৯

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

সিলেট নগরীর বাগবাড়িতে অবস্থিত বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন, এতিম ও অবহেলিত শিশুদের অন্যতম আশ্রয়স্থল ‘সিলেট ইনক্লুসিভ স্কুল অ্যান্ড কলেজে’ শিক্ষা ও প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়ে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। চার শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণ, প্রশাসনিক নির্দেশনা অমান্য ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। এতে বিশেষায়িত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালনায় সমাজকল্যাণ কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে মূলত সরকারি শিশুনিবাসের এতিম ও প্রতিবন্ধী শিশু এবং স্থানীয় নিম্নআয়ের পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। ২০১৯ সালের সমন্বিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের একটি ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হওয়ার কথা। তবে অভিযোগ রয়েছে, বারবার ছাড় পাওয়ায় অভিযুক্ত শিক্ষকরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

বিদ্যালয়ের নথি, জেলা শিক্ষা অফিসের তদন্ত প্রতিবেদন এবং শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগ থেকে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানের চলমান বিশৃঙ্খলার মূলে রয়েছেন সহকারী শিক্ষক আকলিমা বেগম এবং তিন খণ্ডকালীন শিক্ষক—মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিন।

নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে নিয়োগের সময় ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রির শর্ত থাকলেও আকলিমা বেগম তখন ছিলেন এইচএসসি পাস। তাঁর স্বামী সে সময় সমাজসেবা অধিদপ্তরে কর্মরত থাকায় ‘মান মানবিক বিবেচনায়’ তাঁকে শর্তসাপেক্ষে নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

তবে চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠতে থাকে। এর মধ্যে দ্বিতীয় সন্তানের তথ্য গোপন করে তৃতীয় সন্তানের সময় দ্বিতীয়বার মাতৃত্বকালীন ছুটি নেওয়া এবং সরকারি ভাতা নেওয়ার অভিযোগ অন্যতম।

এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই অনার্স, মাস্টার্স, বিএসএড ও এমএসএড পরীক্ষার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ছুটি ভোগ এবং এনডিডি (নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটি) কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও অপ্রাসঙ্গিক কোর্সে অংশ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি পরিচালনা কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে নিয়মিত ক্লাস না নেওয়া, প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক নির্দেশ অমান্য করা এবং প্রতিষ্ঠানে অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরির অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই চার শিক্ষক মিলে প্রতিষ্ঠানে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন। তাঁরা নিয়মিত ক্লাস ফাঁকি দিয়ে গোপন বৈঠক করতেন এবং শিক্ষক মিলনায়তনে নারী শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে ইঙ্গিতপূর্ণ ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেন বলেও লিখিত অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ফারজানা ইসরাত এসব অনিয়মের বিষয়ে পরিচালনা কমিটির কাছে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ করেছিলেন। তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

অনিয়মের প্রতিবাদ করায় অভিযুক্ত শিক্ষকরা উল্টো ফারজানা ইসরাতের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে অপপ্রচার চালান বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। ফারজানা ইসরাতের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে ছড়ানো সব অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও প্রতিশোধমূলক।

বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি নথিপত্রে আগের বেশ কিছু অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছেন। এসব নথি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিচালনা পর্ষদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে স্বাভাবিক, নিরাপদ ও ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে।

যোগাযোগ করা হলে সহকারী শিক্ষক আকলিমা বেগম নিয়োগের সময় শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে একাধিক মাতৃত্বকালীন ছুটির বিষয়ে তিনি করোনাকালীন পরিস্থিতির দোহাই দেন।

অন্যদিকে তিন খণ্ডকালীন শিক্ষক মিনহাজুল ইসলাম, আশরাফুল ইসলাম ও রুহুল আমিন তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে নিজেদের মধ্যে একটি বিশেষ ‘গ্রুপিং’ থাকার কথা স্বীকার করেছেন তাঁরা।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির এমন পরিস্থিতিতে অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং স্কুলে দ্রুত শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

নীরব চাকলাদার

মন্তব্য করুন:

Led Bottom Ad
Led Bottom Ad