মধুচক্রে মধুর ম্যাজিক: সিলেটের অন্ধকার গলিতে পুলিশের আলো
এক সময় সন্ধ্যা নামলেই সিলেট নগরীর কিছু হোটেল যেন জেগে উঠত অন্য এক জগতে— আলো-আঁধারের খেলায় লুকানো ছিল অনৈতিকতার ব্যবসা। হোটেলের পর্দা নামলেই শুরু হতো গোপন আসর, যেখানে মানবতার মুখ ঢেকে যেত লোভ আর লজ্জার আড়ালে। কিন্তু এবার সেই অন্ধকারে জ্বলেছে এক প্রদীপ। দায়িত্ব নেওয়ার দিনই যিনি বলেছিলেন—“সিলেটের কোনো হোটেলে অসামাজিক কার্যকলাপের প্রমাণ মিললে সঙ্গে সঙ্গে সিলগালা করা হবে”—
সেই অঙ্গীকার আজ বাস্তব হয়ে উঠছে। কথা রাখলেন ম্যাজিক ম্যান সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। এবার একের পর এক মধুচক্রে আঘাত হানছেন তিনি। কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হোটেলগুলোতে চলছে একের পর এক অভিযান, আর তাতে ভেঙে পড়ছে তথাকথিত ‘মধুচক্রের’ আস্তানা।
এর আগে বছরের পর বছর ধরে মিরাবাজার, বন্দরবাজার, লালদীঘির পাড়, তালতলা, শিবগঞ্জ, কাজলশাহ— এমন সব এলাকার হোটেলগুলো ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিল অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। রাত যত গভীর হতো, এই হোটেলগুলোয় তত বাড়ত অনৈতিক লেনদেন। তরুণ-তরুণীদের ফাঁদে ফেলার এই দালালচক্রের বিরুদ্ধে বহুবার আওয়াজ উঠলেও পরিবর্তন আসেনি। কিন্তু এবার দৃশ্যপট বদলেছে। পুলিশের অভিযান এখন শুধু আইনি নয়— সামাজিক প্রতিরোধের প্রতীক।
গত ২১ অক্টোবর, তালতলা এলাকার হোটেল বিলাসে অভিযান চালিয়ে পুলিশ পাঁচজন নারী-পুরুষকে আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ— তারা সেখানে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন। অভিযানের পরই হোটেলটি সিলগালা করা হয়।
এর আগে ১৩ অক্টোবর, দক্ষিণ সুরমার সিলেট রেস্ট হাউস একই অভিযোগে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর আরও দুটি হোটেল— গ্র্যান্ড সাওদা হোটেল ও আল সাদী হোটেল— বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। এসব অভিযানে এখন পর্যন্ত ১২ জন নারী-পুরুষ গ্রেফতার হয়েছেন।
এসএমপি কমিশনার দায়িত্ব নেওয়ার পরই হোটেল মালিকদের নিয়ে বৈঠকে যে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন—“অসামাজিক কার্যকলাপের প্রমাণ মিললেই হোটেল সিলগালা করা হবে, কেউ ছাড় পাবে না”—তার প্রতিটি শব্দ এখন বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে। গোয়েন্দা সদস্য ও পোশাকধারী পুলিশ নিয়মিত মাঠে আছেন। অভিযোগ উঠলেই অভিযান, প্রমাণ মিললেই সিলগালা— এখন এটি নিয়মে পরিণত হয়েছে।
এসএমপি’র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) ও মিডিয়া অফিসার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমরা চাই নগরবাসী যেন নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশে বাঁচতে পারে। এজন্যই এই অভিযান। ইতোমধ্যে চারটি হোটেল সিলগালা করা হয়েছে, ১২ জন গ্রেফতার। এই ধারাবাহিকতা চলবে।”
সিলেটের মানুষ আজ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে। যে শহর একসময় লজ্জার কুয়াশায় ঢেকে গিয়েছিল, সেই শহর ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে নিজের মর্যাদা।
কমিশনারের কথায় এক নতুন বার্তা স্পষ্ট— শুধু আইন নয়, এটি নৈতিকতারও পুনর্জাগরণ। “অভিযোগ পেলেই অভিযান, প্রমাণ মিললেই সিলগালা”— এই নীতিতেই যেন নতুন করে জেগে উঠছে নৈতিক সিলেট।
রোদ্দুর রিফাত
মন্তব্য করুন: