একই স্থানে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের শেষ ঠিকানা

শতবর্ষী ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য এক আঙিনা

একই স্থানে হিন্দু, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের শেষ ঠিকানা

নিজস্ব প্রতিনিধি, কমলগঞ্জ

০৬/০৫/২০২৬ ১১:০৭:৪৭

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ধর্মীয় বিশ্বাসে ভিন্নতা থাকলেও পরপারে যাওয়ার যাত্রাপথে সবাই এক। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার পাত্রখোলা চা বাগানে দীর্ঘ দেড়শ বছর ধরে বজায় থাকা এক বিরল দৃশ্য যেন সেই সত্যকেই মনে করিয়ে দেয়। এখানে একই সীমানার ভেতরে পাশাপাশি অবস্থিত হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্মশান, মুসলমানদের কবরস্থান এবং খ্রিস্টানদের সমাধিস্থল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন উদাহরণ দেশে তো বটেই, বিশ্বজুড়েও বিরল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, ১৮৭৫ সালে পাত্রখোলা চা বাগান প্রতিষ্ঠার সময় তৎকালীন কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিকের শেষকৃত্যের জন্য পাঁচ একর জমি বরাদ্দ দেয়। সেই থেকেই এই বিশাল আঙিনায় তিন ধর্মের মানুষের শেষ বিদায় পাশাপাশি সম্পন্ন হচ্ছে। বাগানের মুরব্বিরা চেয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অমলিন দৃষ্টান্ত রেখে যেতে, যা আজও কোনো প্রকার বিরোধ বা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই টিকে আছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, চা বাগানের এই নির্দিষ্ট স্থানে এক পাশে হিন্দুরা তাঁদের শাস্ত্রীয় মতে সৎকার করছেন, অন্য পাশে মুসলিমরা দাফন করছেন এবং ঠিক পাশেই খ্রিস্টানরা তাঁদের সমাধিস্থলে আপনজনকে বিদায় জানাচ্ছেন। এই সম্প্রীতির চিত্র কেবল শেষকৃত্যে সীমাবদ্ধ নয়; বাগানের ঈদ, পূজা কিংবা বড়দিনেও সকল ধর্মের মানুষ একে অপরের উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।

পাত্রখোলা চা বাগান সার্বজনীন মন্দিরের পুরোহিত রাজেশ প্রসাদ শর্মা, জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল আজিজ এবং স্থানীয় গির্জার সদস্য উজ্জ্বল বিশ্বাস একবাক্যে এই সহাবস্থানকে গর্বের বিষয় হিসেবে অভিহিত করেন। তাঁরা জানান, ইহকালের মতো পরকালেও তাঁরা একসাথেই থাকতে চান। তবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের এই স্থানটি বর্তমানে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কিছুটা জীর্ণ হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা সমাধিস্থলটির সীমানা দেয়াল নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ রাস্তা সংস্কার ও প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজের জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান এই সহাবস্থানকে ‘বিরল ও অনুকরণীয়’ উল্লেখ করে বলেন, “কমলগঞ্জে বিভিন্ন ভাষা ও ধর্মের মানুষের যে সংহতি দেখা যায়, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। একই আঙিনায় তিন ধর্মের শেষ বিদায়ের এই স্থানটি মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

পাত্রখোলার এই সমাধিভূমি আজ কেবল একটি সাধারণ স্থান নয়, বরং মানুষের ধর্মীয় ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের এক জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে।


এ রহমান

মন্তব্য করুন: