দেড় দশকে বজ্রপাতে সাড়ে চার হাজার মানুষের মৃত্যু
দেশে গত দেড় দশকে বজ্রপাতে ৪ হাজার ৫০৮ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যার একটি বড় অংশই হাওরাঞ্চল ও গ্রামাঞ্চলের শ্রমজীবী কৃষক। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের হার ১০ শতাংশ বাড়লেও এর প্রতিকারে গৃহীত সরকারি প্রকল্পগুলো চরম অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কবলে পড়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে 'গায়েবি' তালগাছ প্রকল্পের নামে প্রায় শতকোটি টাকা লোপাটের বিষয়টি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই নেওয়া এই প্রকল্পকে বিশেষজ্ঞরা স্রেফ 'অর্থের অপচয়' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৩৫০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বহুগুণ বেশি। জিডাস্টার ফোরামের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছরই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হয়েছে। চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে বজ্রপাতে ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে গতকাল শনিবার একদিনেই সুনামগঞ্জ, রংপুর ও ময়মনসিংহে ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মৃতদের ৭০ শতাংশই মাঠে কাজ করার সময় এবং ১৩ শতাংশ মাছ ধরা বা গোসলের সময় দুর্ঘটনার শিকার হন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে বজ্রপাত থেকে সুরক্ষা দিতে দেশজুড়ে তালগাছ লাগানোর বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি। পরিকল্পনা কমিশনের মতে, কোনো স্টেকহোল্ডার বা অংশীজনের সাথে আলোচনা ছাড়াই এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তালগাছ প্রকল্প বাতিল করে 'লাইটনিং অ্যারেস্টার' বা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। ৩০-৪০ ফুট লম্বা এই দণ্ডগুলো নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে বজ্রপাতকে টেনে মাটিতে নামিয়ে আনে। তবে যন্ত্রটির সীমাবদ্ধতা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে এখনো সংশয় কাটেনি।
আবহাওয়াবিদ ড. মো. আবুল কালাম মল্লিক জানান, গত বছরের ১ এপ্রিল থেকে বজ্রপাতের 'অ্যালার্ট মেসেজ' দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি জনসচেতনতার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র দে সরকার জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার পূর্বাভাস ও সচেতনতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে জেলাগুলো বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ (সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট), সেখানে দ্রুত কার্যকর প্রযুক্তি ও আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন না করলে মৃত্যুর এই মিছিল থামানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
এ রহমান
মন্তব্য করুন: