জেল থেকে বের হয়েই ‘রাজকীয় সংবর্ধনা’!
সিলেটে গোপনে ছবি তুলে সাম্প্রদায়িক বিষবাস্প ছড়ানোর পুরস্কার
দিনের পর দিন প্রগতির বুলি আওড়ানো ২৪-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে ‘সংস্কার’-এর সংজ্ঞা বোধহয় এখন সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে! সিলেটে রেস্টুরেন্টে আসা ভিন্নধর্মী দুই কাস্টমারের একান্ত মুহূর্তের ছবি গোপনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে গ্রেপ্তার হওয়া দুই কর্মচারীর জামিন এবং পরবর্তীতে জেলের ফটকে তাদের রাজকীয় সংবর্ধনা পাওয়ার দৃশ্য অন্তত তাই প্রমাণ করে। সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে প্রশ্ন জাগে—অপরাধীদের জন্য তবে কি তবে এভাবেই লাল গালিচা বিছানোই বর্তমান সময়ের নতুন ‘উন্নয়ন-অগ্রগতি’?
ঘটনার সূত্রপাত সিলেটের জনপ্রিয় ‘মেহমান রেস্টুরেন্ট’-এ। সেখানে খেতে যাওয়া এক যুবক ও যুবতীর (যাঁরা ভিন্ন ধর্মের) একসাথে বসার দৃশ্য গোপনে ক্যামেরাবন্দি করে ফেসবুকে ছেড়ে দেন ওই রেস্টুরেন্টেরই দুই কর্মচারী। এই একটিমাত্র ঘটনায় লুকিয়ে রয়েছে অপরাধের ত্রিমুখী ত্রাস:
১. ফৌজদারি অপরাধ: কারও অনুমতি বা অজান্তে গোপনে ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দেওয়া স্পষ্টতই আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ।
২. নারীর গোপনীয়তা ও সামাজিক ক্ষতি: একজন নারীর ছবি এভাবে বিকৃত উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার সামাজিক পরিণতি কতোটা মারাত্মক হতে পারে, তা বোধহয় এই বিকৃত মানসিকতার লোকগুলো বোঝে না।
৩. সাম্প্রদায়িক উসকানি: ছবি ছড়ানোর মূল উদ্দেশ্য ছিল অত্যন্ত হীন—হিন্দু-মুসলিম বিভাজন তৈরি করা, সাম্প্রদায়িক ঘৃণা উসকে দেওয়া এবং সমাজে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করা।
জনরোষ ও অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করলেও স্বস্তি টেকেনি একদিনও। ঝড়ের বেগে জামিন পেয়ে কারাগার থেকে বের হওয়ার পরদিন ওই দুই অপরাধীকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হয়। ঠিক যেমনটি অতীতে শাহবাগ থানায় এক নারী নিপীড়ককে ফুল দিয়ে বরণ করার মতো লজ্জাজনক ঘটনা দেখা গিয়েছিল। এই দুই ঘটনার বার্তা একটাই—অপরাধ করো, পার পেয়ে যাও, সমাজের চোখে অপরাধী হলেও উগ্রবাদীদের কাছে তুমি বীর!
সবচেয়ে লজ্জার বিষয় হলো, জামিনে মুক্ত হওয়ার পরও এই দুই তরুণের আচরণে বিন্দুমাত্র অনুশোচনার লেশমাত্র ছিল না। বরং এক নিউজ পোর্টালে সাক্ষাৎকার দিয়ে তারা উল্টো ধর্মের নামে উগ্রপন্থী মনোভাব জাহির করেছে। অপরাধ করার পর যেখানে অনুতপ্ত হওয়ার কথা, সেখানে তারা যেন সমাজের চোখে বড় কোনো হিরো বনে গেছে!
বিশ্লেষকদের মতে, এই চিত্র আমাদের ভীষণ পরিচিত এক প্যাটার্নের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিবেশী ভারতে উগ্রপন্থীরা যখন সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে জেলে যায় এবং জামিনে ফিরে এসে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়, সিলেটের কারাগারের সামনের এই চিত্র তারই যেন এক নিখুঁত কার্বন কপি। পতাকা আলাদা হতে পারে, কিন্তু উগ্রবাদের নীল নকশা হুবহু এক! সিলেটে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আর বহু সংস্কৃতির সহাবস্থানের এই মাটিতে এই বিষাক্ত বীজ কারা রোপণ করছে? ইউরোপ বা আমেরিকায় বসবাসরত সিলেটিরা যখন সেখানে শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদীদের হাতে বৈষম্যের শিকার হন, তখন কি তাঁরা এই একই মানসিকতাকে সমর্থন করতেন?
সিলেটের বহু মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করে আসছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই কোথা থেকে উড়ে এসে এই উগ্রপন্থী সুবিধাবাদীরা আমাদের হাজার বছরের সামাজিক সম্পর্ককে বিষিয়ে তুলতে চাইছে?
সাধারণ মানুষের একটাই প্রশ্ন—প্রশাসন কি এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে থামাতে পারবে? নাকি এমন নির্লজ্জ সংবর্ধনা চলতে থাকলে বাংলাদেশ ও সিলেটের পরিণতি আরও ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে? অবিলম্বে এই বিদ্বেষের বীজ বপনকারী এবং তাদের পেছনে থাকা কুশীলবদের মুখোশ উন্মোচন করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: