বিজ্ঞাপনের পেরেকবিদ্ধ কমলগঞ্জের গাছপালা: হুমকিতে সবুজ প্রকৃতি ও পরিবেশ
উপজেলার সড়কগুলোর পাশে দাঁড়ালে এখন আর সবুজের সতেজ সৌন্দর্য চোখে পড়ে না। উল্টো গাছের বুকে বিঁধে থাকা সারিসারি লোহার পেরেক আর টিনের সাইনবোর্ড পথচারীদের মনে পীড়া দেয়। চিকিৎসাসেবা, কোচিং সেন্টার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের শুভেচ্ছা বার্তা-কোনো কিছুই বাদ যাচ্ছে না। প্রচারণার নামে উপজেলার হাজার হাজার গাছকে পেরেকবিদ্ধ করে এভাবেই চলছে পরিবেশবিধ্বংসী কাণ্ড।
দীর্ঘদিন ধরে নির্বিচারে চালানো এই নির্মমতায় একদিকে যেমন বৃক্ষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে স্থানীয় প্রাকৃতিক ভারসাম্য।
কমলগঞ্জ পৌর এলাকা, ভানুগাছ বাজার, শমশেরনগর, মুন্সিবাজার ও আদমপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কের পাশের প্রায় প্রতিটি গাছই এখন বিজ্ঞাপনের আড়ালে ঢেকে গেছে।
এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনের গাছগুলোতেও সাঁটানো হয়েছে যৌন ও অনভিপ্রেত চটকদার কবিরাজি ও হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাসেবার বিজ্ঞাপন, যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
স্থানীয়দের তথ্যমতে, গত এক দশক ধরে গাছে সাইনবোর্ড ও ব্যানার লাগানোর এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে নির্বাচন বা বিভিন্ন জাতীয় দিবস এলে রাতারাতি বদলে যায় গাছগুলোর চেহারা। কোনো প্রকার বাধা বা বাড়তি খরচ ছাড়াই রাজনৈতিক আধিপত্য কিংবা ব্যবসার প্রচার চালাতে গিয়ে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি আইনকানুনকে পুরোপুরি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন।
গাছে পেরেক ঠোকার এই মারাত্মক প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা। সেভ ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড নেচার (মৌলভীবাজার ইউনিট) এর সভাপতি মো. আহাদ মিয়া বলেন, বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে গাছের অনুভূতি রয়েছে। গাছে লোহার পেরেক ঠোকার ফলে এর জাইলেম ও ফ্লোয়েম টিস্যু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে গাছ মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করতে পারে না।
পরিবেশকর্মী নূরুল মোহাইমিন মিল্টন জানান, পেরেকের কারণে তৈরি হওয়া ক্ষতের ভেতরের অংশ দিয়ে ক্ষতিকারক অণুজীব ও ছত্রাক প্রবেশ করে। এতে গাছে অকালেই পচন ধরে এবং তা একসময় মরে যায়। প্রচারণার নামে গাছের ওপর এই নিষ্ঠুরতা বন্ধে বিকল্প পরিবেশবান্ধব মাধ্যম ব্যবহারের জোর দাবি জানান তাঁরা।
গাছে পেরেক মেরে সাইনবোর্ড লাগানোকে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সন্দ্বীপ তালুকদার বলেন, পেরেক ঠুকে সাইনবোর্ড লাগানো গাছের জীবন ধ্বংস করার শামিল। আমরা দ্রুতই উপজেলাজুড়ে এ বিষয়ে কঠোর সচেতনতামূলক অভিযান চালাব। এরপরও যারা আইন অমান্য করে গাছের ক্ষতি করবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকৃতির পরম বন্ধু ও মানবজাতির বেঁচে থাকার মূল রসদদাতা এই গাছগুলোকে বাঁচাতে দ্রুত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ও নির্দেশনাসংবলিত ব্যানার-সাইনবোর্ড উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজ।
কামরান আহমদ/ নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: