বেওয়ারিশ লাশের শেষ যাত্রা ময়লা টানার গাড়িতে!

বেওয়ারিশ লাশের শেষ যাত্রা ময়লা টানার গাড়িতে!

বিশেষ প্রতিবেদন

১০/০৬/২০২৬ ০০:০৭:৫৫

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

জন্মের পর মানুষের কত শত পরিচয় থাকে। কেউ ভাই, কেউ বাবা, কেউবা কারও আদরের সন্তান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে মৃত্যুর পর সব পরিচয় মুছে গিয়ে কপালে জোটে একটিই নাম—‘বেওয়ারিশ’। যার কেউ নেই, তার শেষ বিদায়টুকু অন্তত সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মৌলভীবাজারে অজ্ঞাতনামা মরদেহগুলোর শেষ যাত্রার গল্পটা বড্ড করুণ ও বেদনার। সেখানে মৃত্যুর পর মানুষের শেষ সম্মানটুকু ঢাকা পড়ে যাচ্ছে শহরের ময়লা-আবর্জনার নিচে। মঙ্গলবার ঘটনাটি ঘটে মৌলভীবাজার সদরে। 


মৌলভীবাজারের বিভিন্ন উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রায়শই উদ্ধার হয় অজ্ঞাত পরিচয়হীন মরদেহ। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হলেও অনেক সময় তা সম্ভব হয় না। আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে যখন কোনো স্বজন এগিয়ে আসে না, তখন এই মানবদেহগুলোর ঠাঁই হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।


পরিচয় না থাকলেই কি একজন মানুষের লাশের প্রতি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়? স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, শেষ বিদায়ের সময় অন্তত একজন মানুষ হিসেবে যে ন্যূনতম ধর্মীয় ও মানবিক সম্মান পাওয়ার কথা, তা থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত হচ্ছে এই অবহেলিত মরদেহগুলো।


সবচেয়ে নির্মম ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায় এই লাশগুলো বহনের ক্ষেত্রে। মৌলভীবাজারে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের উদ্দেশ্যে বহনের জন্য যে গাড়িটি ব্যবহার করা হয়, তা নিয়ে স্থানীয়দের মনে গভীর ক্ষোভ ও কষ্ট রয়েছে।


ক্ষোভের সঙ্গে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ‘যেকোনো মানুষই হোক না কেন, মৃত্যুর পর তার একটা মর্যাদা থাকে। আর এই মর্যাদাটুকু রক্ষা করার দায়িত্ব পৌরসভার। কিন্তু এখানে বছরের পর বছর ধরে বাধ্য হয়ে পৌরসভার যে ময়লা ফেলার গাড়ি (গার্বেজ ট্রাক) রয়েছে, তা দিয়েই এই লাশগুলো বহন করা হয়। অনেক সময় হয়তো গাড়িটি কোনোমতে ধুয়ে-মুছে নেওয়া হয়, কিন্তু তা সত্ত্বেও—যে গাড়িতে দিনভর শহরের সব নোংরা আবর্জনা টানা হয়, সেই গাড়িতে একজন মানুষের মরদেহ বহন করা কতটা অমানবিক ও অবমাননাকর?’


কেবল পরিচয়হীন কিংবা স্বজনহীন হওয়ার কারণে জীবনের শেষ বিদায়টুকু সম্পন্ন হচ্ছে এমন এক যন্ত্রণাদায়ক উপায়ে, যা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া কঠিন। মৃত্যুর পরেও একজন মানুষ কেন সম্মানজনক বিদায় পাবেন না—এই প্রশ্ন এখন বিবেকবান প্রতিটি মানুষের।


স্থানীয়দের দাবি, প্রতিটি মানুষেরই অধিকার আছে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে এবং যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে শেষ বিদায় পাওয়ার। পৌরসভা ও জেলা প্রশাসনের কাছে নাগরিকদের আকুল আবেদন—বেওয়ারিশ লাশ বহনের জন্য অন্তত একটি নির্দিষ্ট ও সম্মানজনক গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হোক। আবর্জনার গাড়িতে মানুষের শেষ যাত্রা যেন আর দেখতে না হয়।


জীবনের শেষ বেলায় এসে যাঁরা সব পরিচয় হারিয়েছেন, সমাজ যেন অন্তত তাঁদের ‘মানুষ’ হিসেবে বিদায় জানায়—আজকের দিনে এটাই মৌলভীবাজারবাসীর সবচেয়ে বড় মানবিক আকুতি।

মীর্জা ইকবাল

মন্তব্য করুন: