সুরমা-কালনীর বুকে বৈঠার ছন্দবদ্ধ আঁচড়, তীরের মানুষের সশব্দ উল্লাস!
‘কোন মেস্তরি নাও বানাইছে, কেমন দেখা যায় / ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূর পঙ্খী নায়...’— বাউলসম্রাট শাহ আব্দুল করিমের সেই অমিয় সুরের দ্যোতনা, ঢোল-কর্তালের তাল আর শত বৈঠার একসাথে জল কাটার গর্জনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল হাওরাঞ্চলের শান্ত নদীটি। গ্রামীণ রূপসী বাংলার অতি প্রাচীন ও প্রাণের সংস্কৃতি ‘দৌড়ের নৌকা বাইচ’ প্রতিযোগিতায় মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এক অভূতপূর্ব উৎসবের জোয়ার ভেসে গেল সুনামগঞ্জের শাল্লায়।
বাহাড়া ইউনিয়নের ভাটগাঁও গ্রামবাসীর উষ্ণ আয়োজনে স্থানীয় নদীর বুকে আয়োজিত এই লোক-উৎসবে শুধু প্রতিযোগিতা ছিল না, ছিল ভাটিবাংলার নিজস্ব আবেগ ও জীবনের উদ্ভাস। জলতরঙ্গে গতি আর ছন্দের মেলবন্ধন ঘটাতে এতে দূর-দূরান্ত থেকে অংশ নেয় সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ঐতিহ্যবাহী ৭টি দৌড়ের নৌকা।
নদীর দুই কূলে তখন জনসমুদ্র। ছোট-বড় সাম্পান, ডিঙি আর ট্রলারে সওয়ার হয়ে আসা আবালবৃদ্ধবনিতার উল্লাস ও মুহুর্মুহু করতালিতে নদীর শান্ত জল ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল। মাঝিদের কণ্ঠে সারি গান, বৈঠার ছন্দবদ্ধ আঁচড় আর তীরের মানুষের সশব্দ উল্লাসে প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল এক অপরূপ কাব্যের মতো।
প্রতিযোগিতা শেষে আয়োজিত সমাপনী পর্বে বিজয়ীদের হাতে ঐতিহ্যবাহী উপহার তুলে দেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সহধর্মিণী মোছা: পারভীন আক্তার।
জলের বুকে গতির সেই মহারণে বিজয়ের মুকুট ছিনিয়ে নেয় হবিগঞ্জের কালাই মিয়ার তরী; ১ম পুরস্কার হিসেবে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সোনালী ঐতিহ্যের প্রতীক ‘আকর্ষণীয় স্বর্ণের ধান ছড়া’। অন্যদিকে, জল চিরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা সুনামগঞ্জের শাল্লার মাতাব আলীর তরী ‘স্বপ্নের তরী’ অর্জন করে ২য় পুরস্কার ‘রূপার শাপলা’।
উৎসবে উপস্থিত থেকে মেলাকে মহিমান্বিত করেন স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস কর্মী, রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দসহ গণমাধ্যমকর্মীরা।
ভাটিবাংলার রূপ ও প্রীতিতে মুগ্ধ হয়ে প্রধান অতিথি মোছা: পারভীন আক্তার বলেন, "নৌকা বাইচ কেবল খেলা নয়, এ যেন আমাদের অস্তিত্ব ও সম্প্রীতির সুর। জীবনে প্রথমবার এই আনন্দধারা প্রত্যক্ষ করে আমি অভিভূত। এমপি নাছির চৌধুরী আপনাদের সকলের প্রতি ভালোবাসা ও শুভকামনা জানিয়েছেন। এই মাতোয়ারা উৎসব যেভাবে মানুষের মনকে এক সুতোয় বেঁধে ফেলে, সেই অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারাকে আমাদের টিকিয়ে রাখতে হবে।"
তীব্র প্রতিযোগিতা, জয়-পরাজয়ের শিহরণ আর হৃদয়ের গভীর আবেগ নিয়ে গোধূলিলগ্নে নদীর জলে ছায়া ফেলে শেষ হয় রূপসী বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই জলজ উৎসব।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: