সিলেটে যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন
‘প্রকৃতি থেকে প্রেরণা, জলবায়ুর জন্য, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য’— এই অত্যন্ত সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী প্রতিপাদ্য বিষয়টিকে সামনে রেখে পুণ্যভূমি সিলেটে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০২৬ উদযাপিত হয়েছে; গতকাল শুক্রবার (৫ জুন) আন্তর্জাতিক এই দিবসটি উপলক্ষে সিলেটের শীর্ষস্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক-স্বেচ্ছাসেবী পরিবেশবাদী ফোরামের উদ্যোগে দিনভর বর্ণাঢ্য সচেতনতামূলক র্যালি, উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভা এবং ফলদ, বনজ ও ওষুধি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। দিবসটির শুরুতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি) পরিবেশবিজ্ঞান ও সামাজিক অনুষদের উদ্যোগে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সমন্বয়ে একটি সুবিশাল বর্ণাঢ্য র্যালি ক্যাম্পাস ও আশপাশের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ করে; র্যালি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সম্মুখ চত্বরে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একটি পবিত্র নিমগাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক শুভ উদ্বোধন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘পরিবেশের টেকসই সুরক্ষা ও আমাদের করণীয়’ শীর্ষক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির দিকনির্দেশনামূলক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য (ভিসি) প্রফেসর ড. মো. আলিমুল ইসলাম; তিনি তাঁর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বেশি করে গাছ লাগানোর এবং ক্যাম্পাসকে সম্পূর্ণ প্লাস্টিকমুক্ত রাখার উদাত্ত আহ্বান জানান। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর প্রফেসর ড. সামিউল আহসান তালুকদারের অত্যন্ত সুকুশলী ও প্রাণবন্ত পরিচালনায় এই একাডেমিক সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন— সিকৃবি আইকিউএসি (IQAC) সেলের পরিচালক প্রফেসর ড. এম. রাশেদ হাসনাত, কৃষি অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সম্মানিত ডিন প্রফেসর ড. শাহ জাহান মজুমদার, ভেটেরিনারি, অ্যানিমেল অ্যান্ড বায়োমেডিকেল সায়েন্সেস অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন প্রফেসর ডা. মো. রফিকুল ইসলাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর ড. মুহাম্মদ রাশেদ আল মামুন এবং জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তরের পরিচালক খসরু মোহাম্মদ সালাউদ্দিনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীবৃন্দ।
এদিকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও পরিবেশবান্ধব জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সিলেট মহানগর শাখার উদ্যোগে এক বিশাল ‘বৃক্ষ র্যালি’ ও সাধারণ পথচারীদের মাঝে বিনামূল্যে ওষুধি ও ফলদ গাছের ‘চারা বিতরণ’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। গতকাল সকালে নগরীর ব্যস্ততম রিকাবীবাজার পয়েন্ট থেকে শতশত ছাত্র নেতাকর্মীর সুশৃঙ্খল অংশগ্রহণে এই বর্ণাঢ্য বৃক্ষ র্যালিটি শুরু হয়ে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণপূর্বক চৌহাট্টা পয়েন্টে গিয়ে এক সংক্ষিপ্ত ও সফল সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়; ছাত্রশিবির সিলেট মহানগরীর অফিস সম্পাদক নাঈম হোসাইনের সুশৃঙ্খল পরিচালনায় উক্ত পরিবেশ সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন ছাত্রশিবিরের সিলেট মহানগর শাখার সভাপতি শহীদুল ইসলাম সাজু। তিনি তাঁর বক্তব্যে তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ বিপর্যয় রোধে এবং গ্রিন সিটি গড়তে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দেন এবং সমাবেশ শেষে সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের হাতে গাছের চারা তুলে দেন।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক এই দিবসটিকে কেন্দ্র করে সিলেটের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন ফোরাম’ (ইপিএফ) এবং সমাজসেবামূলক সংস্থা ‘শাহ ফাউন্ডেশন সিলেট’-এর যৌথ যৌথ উদ্যোগে ‘প্রকৃতি রক্ষাই জলবায়ুর সুরক্ষা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল ও বিশেষ আলোচনা সভা নগরীর কেন্দ্রস্থল জিন্দাবাজারের একটি অভিজাত মিলনায়তনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অনুষ্ঠিত হয়। ইপিএফ-এর সিলেট বিভাগীয় প্রধান সমন্বয়ক প্রবীণ পরিবেশকর্মী লিয়াকত শাহ ফরিদীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সংবেদনশীল সেমিনারে মূল আলোচক ও অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অত্যন্ত তথ্যবহুল বক্তব্য পেশ করেন— শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) বিশিষ্ট শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হক, নবীগঞ্জ সরকারি কলেজের সাবেক নীতিবান অধ্যাপক গোলাম হোসেন আজাদ, সিলেটের স্বনামধন্য শিক্ষক ও পরিবেশ গবেষক মিহির কান্তি, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সংগ্রাম সিংহ, সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন এবং সিলেটের হাওর ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষ নেতা কাশ্মির রেজা প্রমুখ। আলোচনা সভায় উপস্থিত পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞ বক্তারা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সিলেটের সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ রূপের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “সিলেটের পাহাড়, টিলা নিধন এবং নদী-হাওর ভরাটের কারণে আজ এই অঞ্চলের সামগ্রিক প্রকৃতি ও পরিবেশ চরম ধ্বংসের মুখে উপনীত হয়েছে; কেবল দিবসকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আমাদের প্রিয় ধরিত্রী, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমন্বিত ও কঠোর আইনি উদ্যোগই কেবল আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, দূষণমুক্ত ও টেকসই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারবে।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: