সুনামগঞ্জে ‘হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’ এর ৫১ সদস্যের কমিটি গঠন
বাংলাদেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে ‘হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন এবং ফসল রক্ষা বাঁধের নামে অনিয়ম লুটপাট বন্ধের জোরালো দাবি উঠেছে। ৪ আগস্ট (মঙ্গলবার) সন্ধ্যা ৮টায় সুনামগঞ্জ শহরের শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগারে ‘হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’ এর এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সর্বসম্মতিক্রমে সুনামগঞ্জের ৪টি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্যদের (এমপি) উপদেষ্টা রেখে এবং নুরুল হক আফিন্দীকে সভাপতি ও এ কে কুদরত পাশাকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করে ৫১ সদস্য বিশিষ্ট ‘হাওর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’ এর পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে, জাতীয় প্রেসক্লাব ও স্থানীয় সংবাদ সম্মেলনের লিখিত প্রস্তাবনার আলোকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ দাবি উপস্থাপন করেছেন।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, মৎস্য, বালি, ধান সুনামগঞ্জের প্রাণ প্রবাদটি আজ গভীর সংকটে। বর্তমানে কৃষি, পানিসম্পদ, মৎস্য, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও নৌপরিবহনসহ একাধিক মন্ত্রণালয় পৃথকভাবে হাওর নিয়ে কাজ করায় চরম সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহিতাহীনতা তৈরি হচ্ছে। এই সংকট নিরসনে একটি একক কর্তৃপক্ষের অধীনে সমন্বিত পরিকল্পনা, গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে হাওর বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
নূরুল হক আফেন্দির সভাপতিত্বে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান, দৈনিক সুনামকণ্ঠ সম্পাদক বিজন সেন রায়, মো: আলী নূর, জিয়াউর রহমান, আবু নেছার, সৈয়দ মহিবুল ইসলাম, সুখেন্দু সেন, মো: ইয়াকুব বখত, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর সম্পাদক পঙ্কজ দে, সাংবাদিক লতিফুর রহমান রাজু, আনিসুল হক, হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন, সাংবাদিক এ কে কুদরত পাশা, কর্ণবাবু, প্রীতম দাস, শাল্লা কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অশেষ তালুকদার এবং রীনা আক্তারসহ স্থানীয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃবৃন্দ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির পক্ষ থেকে উপস্থাপিত নথি অনুযায়ী অকাল বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে বোরো ধান রক্ষায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও মূল সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। চলতি ২০২৬ সালে সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ৭১০টি পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি) এর মাধ্যমে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার মাটির বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
তবে নীতিমালা অনুযায়ী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শুরু হয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার নিয়ম থাকলেও, বাস্তবে অধিকাংশ কাজ শুরু হয় ফেব্রুয়ারি বা মার্চে। তড়িঘড়ি করে নিম্নমানের কাজ এবং কান্দা থেকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি কাটার ফলে বাঁধের স্থায়িত্ব যেমন থাকছে না, তেমনি হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। ফলে অস্থায়ী মাটির বাঁধ কৃষকের নিরাপত্তার বদলে দুর্নীতি ও হাওর ধ্বংসের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও নদী-খাল ভরাটের কারণে হাওরের দেশীয় মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের মুখে। একসময় হাওরে ১৪০ থেকে ১৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমে ৬০ থেকে ৭০টিতে নেমে এসেছে। কৃত্রিম সারের নাইট্রোজেন ও ফসফরাস পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমিয়ে মাছের প্লাঙ্কটন ধ্বংস করছে। এই সংকট নিরসনে অস্থায়ী বাঁধের বদলে নদী, খাল ও বিল পুনঃখনন, বিজ্ঞানভিত্তিক স্লুইসগেট নির্মাণ, হিজল করচ গাছ রোপণ, গভীর বিলে মাছের অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং জলবায়ু সহনশীল ও স্বল্পমেয়াদি ধানের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে হাওরাঞ্চলের বিপর্যস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সড়কে মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নিত্যদিনের। দীর্ঘ পাঁচ বছর আগে সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হলেও পর্যাপ্ত ডাক্তার ও যন্ত্রপাতির অভাবে হাসপাতালটি চালু হয়নি। হাওরবাসীর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রেখে চলতি ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের মধ্যেই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার আলটিমেটাম দেন নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ।
চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জের ১৯৩টি হাওরে উৎপাদিত প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন ধান (যার বাজারমূল্য প্রায় ৪,৪৪০ কোটি টাকা) জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বিপুল অবদান রাখছে। দেশের পরিবেশ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় আমলাতান্ত্রিক অজুহাত দূরে ঠেলে অবিলম্বে বিজ্ঞানভিত্তিক ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। সদ্য গঠিত ৫১ সদস্যের এই পরিষদ ও স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমে হাওরবাসীর এই দীর্ঘদিনের দাবি আদায় জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রীতম দাস/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: