হবিগঞ্জে আখই কৃষকদের নতুন ভরসা,আশার আলো

হবিগঞ্জে আখই কৃষকদের নতুন ভরসা,আশার আলো

ফয়সল চৌধুরী,হবিগঞ্জ

১৪/১১/২০২৫ ১৮:৪৫:২৩

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

হালকা বাতাসে দুলে ওঠা সবুজ আখের সারি—দেখলে মনে হয় যেন প্রকৃতি নিজের হাতে সাজিয়ে রেখেছে এক বিশাল সবুজ কার্পেট। হবিগঞ্জের মাঠে এখন এই দৃশ্যই সবচেয়ে পরিচিত। দিন দিন বাড়ছে আখ চাষ, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে কৃষকের মুখের হাসি। কখনো কষ্টে ভরা দিনগুলো আজ যেন ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে এই মিষ্টি ফলনের হাত ধরে।


চুনারুঘাট, মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ, বাহুবল ও রাঙ্গেরগাঁও—জেলার বিভিন্ন প্রান্তে এখন দেখা যায় আখ ক্ষেতে ব্যস্ত কৃষকদের হাঁটাচলা। কখনো শ্রমিকদের দল আগাছা পরিষ্কার করছে, কখনো আবার ক্ষেতের মাঝখান দিয়ে কৃষক হাঁটছেন গর্বিত ভঙ্গিতে। কারণ, এই আখই এখন তাদের নতুন ভরসা, নতুন আশার আলো।


জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এ বছর হবিগঞ্জে নির্ধারিত ৩৯৫ হেক্টর জমির সবটিতেই আখের বীজ বোনা হয়েছে। এর থেকেই ফলেছে ১৮ হাজার ১৭৫ মেট্রিক টনের বেশি আখ—অঞ্চলের জন্য যে পরিমাণ উল্লেখযোগ্য।


উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুরাদ আহমেদ বলেন, “হবিগঞ্জের মাটি আখের জন্য যেন প্রকৃতির উপহার। কৃষকরা দিন দিন আখ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। পরিচর্যা আর বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে আখ হতে পারে তাদের প্রধান আয়ের উৎস।”


শহিদ মিয়ার স্বপ্নের মাঠ

শায়েস্তাগঞ্জ পৌর এলাকার বিরামচর গ্রামে ঢুকলেই দেখা যায়—অন্তহীন মাঠ, আর তার মাঝখানে দুলছে আখের সবুজ বাঁশির সুর। ঠিক সেই মাঠেই দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক শহিদ মিয়া। দেড় একর জমিতে আখ চাষ করেছেন তিনি। এক বছরের শ্রম, পরিশ্রম, হেঁটে যাওয়া অসংখ্য দিন—সবকিছু মিলিয়ে আজ তার চোখে শুধু আনন্দের ঝিলিক।


শহিদ মিয়া বলেন,“প্রথমে ভাবিনি এত সুন্দর ফলন পাবো। মনতলা থেকে শ্রমিক এনে চাষ করেছিলাম। খরচ হয়েছিল অনেক, কিন্তু ফলন দেখে মনে হচ্ছে আল্লাহ্‌ মেহেরবান। এ যেন আমার জীবনের বড় আশীর্বাদ।”


সরকারি সহায়তা ছাড়াই নিজের উদ্যোগে চাষ করেছেন তিনি। তবুও তার স্বপ্ন থেমে নেই। সুযোগ পেলে আরও বড় পরিসরে আখ চাষ করতে চান এই পরিশ্রমী কৃষক।


হবিগঞ্জের কৃষকদের গল্প আজ অন্যরকম। আগে তারা ধান, ভুট্টা আর সবজি চাষে ব্যস্ত থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আখ চাষ তাদের কাছে হয়ে উঠেছে নতুন অধ্যায়ের সূচনা। ভালো ফলন, ভালো দাম—দু’টো মিলেই যেন কৃষকের ঘরে এনে দিয়েছে নতুন স্বপ্ন, নতুন সাহস।


মাধবপুর থেকে বাহুবল—সবখানেই এখন দেখা যাচ্ছে আখ চাষের বিস্তৃতি। মাঠজুড়ে চলছে ব্যস্ততা। কারো হাতে কোদাল, কারো হাতে কাটা আখ। আর সবকিছুর মাঝে কৃষকের মুখে মিষ্টি হাসি—যেন আখের মতোই।


কৃষি বিভাগ বলছে, আখ একটি লাভজনক নগদ ফসল। কম জমিতে বেশি উৎপাদন হয়। আর বাজারেও চাহিদা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। সঠিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দিলে এই জেলার কৃষকদের জন্য আখ হয়ে উঠতে পারে নতুন ‘সোনালি খাত’।


অতিরিক্ত উপপরিচালক দিপক কুমার পাল বলেন, “চুনারুঘাটের আখ দিয়ে যে গুড় তৈরি হয়, তা এখন বাজারে ব্যাপক জনপ্রিয়। আমাদের রিসার্চ ও ট্রেনিং সেন্টার রয়েছে শায়েস্তাগঞ্জে। কৃষকরা চাইলে সব ধরনের সহযোগিতা পাবেন।”


প্রকৃতির এই মিষ্টি দান শুধু কৃষকের ফসলই নয়—বদলে দিচ্ছে তাদের জীবনযাত্রা, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ। হবিগঞ্জের মাঠে যখন বাতাসে দোলা দেয় আখের সবুজ পাতাগুলো, মনে হয়—এই দোলায় লুকিয়ে আছে এক নতুন ভোরের গল্প, নতুন সম্ভাবনার গান।

ডি আর ডি

মন্তব্য করুন: