হরিজন সম্প্রদায় থেকে সরকারি কলেজের নেতৃত্বে মৌলভীবাজারের সুমা
যে সমাজে জন্ম পরিচয়ই কখনো কখনো কারো ভাগ্যের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ করে দেয়, যেখানে অবহেলা আর ছোঁয়াছুঁয়ির অদৃশ্য দেয়াল থমকে দেয় হাজারো আলোকরশ্মি; ঠিক সেখান থেকেই এক অদম্য লড়াইয়ের মহাকাব্য লিখেছেন মৌলভীবাজারের মেয়ে সুমা বাঁসফোর। প্রথাগত অন্ধকারের দেয়াল ভেঙে শিক্ষার আলোয় শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, পুরো হরিজন সম্প্রদায়ের জন্যই তিনি এখন এক নতুন আশার দীপ্তি। সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুমা আজ একটি সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।
মৌলভীবাজার পৌরসভার ক্লাব রোড এলাকার এক অতি সাধারণ হরিজন পরিবারে সুমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা বুধু বাঁসফোর ও মা তারাবতী বাঁসফোর—দুজনের কেউই আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল ছিলেন না। কিন্তু অন্তরে ছিল বিশাল এক আকাশ। দিনআনার দিনখাওয়ার টানাপোড়েনের মাঝেও তারা কখনো মেয়ের স্বপ্নের ডানায় শৃঙ্খল পরাননি। অভাব-অনটনের নোনা জল পেরিয়ে, সমাজের বাঁকা চোখকে তোয়াক্কা না করে সুমার ভেতরে যে জেদ আর অদম্য লালসা ছিল শিক্ষার প্রতি, তা-ই ছিল তাঁর এগিয়ে যাওয়ার মূল রসদ।
শিক্ষাজীবনের প্রতিটি বাঁকেই সুমাকে লড়তে হয়েছে সমাজের অদৃশ্য বৈষম্য ও আর্থিক অনিশ্চয়তার সঙ্গে। তবে মৌলভীবাজারের মাটিতেই শক্ত হয়েছিল তাঁর স্বপ্নের ভিত্তি। ১৯৯৮ সালে মৌলভীবাজার আলী আমজাদ সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে এসএসসি পাস করেন তিনি। এরপর ভর্তি হন মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে, সেখান থেকেই সম্পন্ন করেন উচ্চমাধ্যমিক। শিক্ষার অদম্য তৃষ্ণা তাঁকে থামতে দেয়নি—একই কলেজ থেকে ২০০৯ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জনের পর ২০১০ সালে জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে অর্জন করেন স্নাতকোত্তর।
জীবনের সব ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে সুমা বাঁসফোর বেছে নেন এক মহান ব্রত—শিক্ষকতা। বর্তমানে তিনি জামালপুরের ইসলামপুর সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত এবং সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব সামলাচ্ছেন বিভাগীয় প্রধানের। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবহেলিত এক ঘর থেকে উঠে এসে একটি সরকারি কলেজের শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব দেওয়া—নিঃসন্দেহে তাঁর জীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল ও রূপকথাতুল্য অর্জন।
সুমার এই পথচলা শুধুই এক সাধারণ সাফল্যের গল্প নয়; এটি সামাজিক শৃঙ্খল ভাঙার এক মহাকাব্যিক বার্তা। তিনি প্রমাণ করেছেন, মেধা, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য জেদ থাকলে জন্ম পরিচয় কিংবা অভাব কখনো বাধা হতে পারে না।
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে দীপ্ত কণ্ঠে সুমা বলেন, “প্রতিকূল পরিস্থিতি দেখে থমকে গেলে চলবে না। সমাজের নেতিবাচক কথা আর বাঁকা দৃষ্টিকে তোয়াক্কা না করে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। সঠিক সুযোগ আর অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো সামাজিক ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করা সম্ভব।”
মৌলভীবাজারের গণ্ডি পেরিয়ে সুমা বাঁসফোরের এই লড়াই আর সাফল্যের গল্প আজ পুরো বাংলাদেশের জন্যই এক অনুপম অনুপ্রেরণা। অন্ধকারে আলো জ্বালানোর এই যাত্রায় তিনি যেন এক জীবন্ত বাতিঘর।
ডিডি/ নীরব
মন্তব্য করুন: