বদলাচ্ছে রাজনগরের কৃষি
ফটিক মিয়ার কলা বিপ্লব!
রাজনগরের কৃষি খাতে অনুপ্রেরণার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করেছেন কৃষক ফটিক মিয়া। বাড়ির পেছনে পড়ে থাকা অনাবাদি ও পরিত্যক্ত একখণ্ড জমিতে রোপণ করা মাত্র ১০০টি কলার চারা আজ এক বিশাল কৃষি বিপ্লবে রূপ নিয়েছে। ফটিক মিয়ার কঠোর পরিশ্রম, উদ্ভাবনী ভাবনা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির ওপর ভর করে কয়েক বছরের ব্যবধানে রাজনগরে শুরু হয়েছে উচ্চফলনশীল কলা চাষের এক নতুন রূপান্তর।
উত্তরবঙ্গের উন্নতমানের 'G-9' জাতের কলাগাছ দিয়ে ফটিক মিয়ার এই সফল যাত্রার সূচনা হয়েছিল। ফ্রিপ (FRIP) প্রকল্পের আওতায় রাজনগর উপজেলা কৃষি অফিস থেকে এই চারাগুলো পাওয়ার পর তিনি নিজের পরিত্যক্ত জায়গায় তা রোপণ করেন। পরবর্তীতে নিবিড় পরিচর্যা ও নিজস্ব উদ্যোগে বাগানটি দ্রুত সম্প্রসারিত হতে থাকে। বর্তমানে তার পুকুরপাড়সহ বাড়ির চারপাশের জমিতে সারি সারি দোল খাচ্ছে প্রায় এক হাজার কলাগাছ।
সবুজ পাতায় ঘেরা সারিবদ্ধ গাছে পুষ্ট কলার বিশাল ছড়ি ঝুলতে দেখে এখন প্রতিনিয়ত আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটছে ফটিক মিয়ার মুখে। বাগানটি থেকে ইতোমধ্যে তিনি প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার কলার ছড়ি বিক্রি করেছেন এবং সামনের দিনগুলোতেও বড় অঙ্কের লাভের প্রত্যাশা করছেন। উৎপাদিত কলার আকর্ষণীয় গঠন ও সুস্বাদু স্বাদের কারণে ধান চাষ বাদ দিয়ে পর্যায়ক্রমে বড় পরিসরে কলার বাগান গড়ে তোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
ফটিক মিয়ার এই অভূতপূর্ব সফলতা শুধু তার নিজের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, আশপাশের গ্রামের অন্যান্য কৃষক ও সম্ভাবনাময় তরুণদের মধ্যেও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। প্রতিদিন অনেক মানুষ তার দৃষ্টিনন্দন বাগান দেখতে এবং পরামর্শ নিতে ভিড় জমাচ্ছেন। ফলিত কলা বিক্রির পাশাপাশি ফটিক মিয়া এখন নিজ উদ্যোগে উদ্ভাবিত G-9 জাতের চারা বিক্রি করেও আকর্ষণীয় অঙ্কের বাড়তি উপার্জন করছেন। এলাকার অনেক কৃষক তার কাছ থেকে চারা সংগ্রহ করে নিজেদের জমিতে কলা চাষ শুরু করছেন।
রাজনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল-আলামিনের মতে, স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী জাতের কলাগাছগুলোতে তুলনামূলক কম ফলন হওয়ায় কৃষকরা দীর্ঘ দিন প্রত্যাশিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। এই ঘাটতি পূরণে উচ্চফলনশীল G-9 জাতের কলার প্রদর্শনী দিয়ে ফটিক মিয়াকে সাহায্য করা হয়। তিনি মনে করেন, রাজনগরে এই উন্নত জাতের কলার বাণিজ্যিক চাষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা বিপুল সংখ্যক মানুষকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে সাহায্য করবে।
স্থানীয় পর্যায়ে এই জাতের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে রাজনগরে আধুনিক কলার একটি স্থায়ী বাণিজ্যিক হাব গড়ে উঠবে, যা ভোক্তাদের জন্য তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত কলা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করবে। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ফল পরিবহনের যে বিশাল ব্যয় ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতবদলের খরচ রয়েছে, তা কমে আসায় একই সঙ্গে কৃষক ও ক্রেতা উভয়েই সরাসরি লাভবান হবেন। কৃষি অফিসের নিরবচ্ছিন্ন পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতায় ফটিক মিয়ার সূচনা করা এই উদ্যোগ আজ পুরো উপজেলার জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: