নজরে নতুন ডিসির পদক্ষেপ
শাহপরান (র.) মাজারে কোটি টাকার অনিয়ম ও নথিপত্র গায়েব: শুনানি ৩০ সেপ্টেম্বর
সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য হযরত শাহপরান (র.) ওয়াকফ এস্টেটে কোটি কোটি টাকার জমি আত্মসাৎ, দানের অর্থ তছরুপ এবং ঢাকা ওয়াকফ প্রশাসনের এক অসাধু সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশে তদন্ত নথিপত্র গায়েবের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এসব অনিয়মের চূড়ান্ত সুরাহা ও সার্বিক তদন্ত নিষ্পত্তিতে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর (বুধবার) সকাল ১১:৩০ টায় ইসলামী ফাউন্ডেশন সিলেটের সম্মেলন কক্ষে এক গণশুনানি আহ্বান করা হয়েছে।
ইফাদ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, অভিযোগকারী শেখ মো. লুৎফুর রহমান ও মো. আমিরুল ইসলামের আবেদনের প্রেক্ষিতে এবং জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের নির্দেশনায় এ শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ইসলামী ফাউন্ডেশন সিলেটের সহকারী পরিচালক মো. সাহাবুদ্দীন সংশ্লিষ্ট উভয় পক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ স্বশরীরে অথবা প্রতিনিধির মাধ্যমে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থায়ীদের অভিযোগে জানা যায়, বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসন (ঢাকা) কার্যালয়ের সহকারী প্রোগ্রামার মো. শাহ আলম ও শাখা কেরানি জসিম উদ্দিনসহ একটি অসাধু চক্র বর্তমান বিতর্কিত মোতোয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশিদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কাজ করছেন। সিলেট জেলা প্রশাসকের পাঠানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন এবং ওয়াকফ প্রশাসনের নিযুক্ত আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মোঃ রাজু মিয়ার সুপারিশগুলো মূল নথিতে না রেখে গোপন করার অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
এর আগে মাজারের দোকানকোঠা ও জমির পজিশন বিক্রি এবং প্রতিদিনের লাখ লাখ টাকার অনুদান তছরুপের অভিযোগে সিলেট অঞ্চলের ওয়াকফ হিসাব নিরীক্ষক (অডিটর) মোহাম্মদ সজল মিঞা সরেজমিনে অডিটের উদ্যোগ নেন। কিন্তু মোতোয়াল্লী পক্ষ বারবার নোটিশ এড়িয়ে গিয়ে সময়ক্ষেপণ করেন এবং উল্টো অডিটরের বিরুদ্ধেই ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলেন। পরবর্তীতে বিষয়টি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হস্তান্তরের সুপারিশ করে ওয়াকফ প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়।
এদিকে মাজারের স্বচ্ছতা ফেরাতে স্থানীয়রা বেশ কয়েকটি দাবির কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, (১) দানবাক্স, মানত, দোকান-স্থাপনা ভাড়া ও জমি ইজারার অর্থ স্বচ্ছ করতে নিরপেক্ষ ফরেনসিক বা স্পেশাল অডিট পরিচালনা। (২) রিট পিটিশন (নং-৬৪৮৬/২০১৪) ও পূর্ববর্তী পদত্যাগপত্রের মূল রেকর্ড পর্যালোচনা করে মোতোয়াল্লী পদে মামুনুর রশিদের অবস্থান পরীক্ষা করা। (৩) এস্টেটের খতিয়ান, দাগ, সীমানা ও বর্তমান দখলের তথ্য সরজমিনে জরিপ করে একটি হালনাগাদ ডিজিটাল রেজিস্টার তৈরি। (৪) একক কর্তৃত্বের বদলে সরকারি তদারকি, স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি জবাবদিহিমূলক পরিচালনা কমিটি গঠন।
এর আগে সিলেটে আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর শৃঙ্খলা ফেরাতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম শাহজালাল (র.) মাজারে নতুন দানবাক্স স্থাপন এবং সর্বসমক্ষে টাকা গণনার মাধ্যমে স্বচ্ছতার মডেল তৈরি করেন। তিনি শাহপরান মাজারেও উচ্ছেদ অভিযান, মেডিকেল সেন্টার, নারীদের নামাজের জায়গা তৈরি ও মাদক নিয়ন্ত্রণের মতো রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এসব প্রশংসনীয় পদক্ষেপের মাত্র দুদিনের মাথায় (২১ জুন ২০২৬) তাকে আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে সংস্কার উদ্যোগ থমকে যায়।
শাহজালাল (র.) মাজারে স্বচ্ছতা সম্ভব হলে শাহপরান (র.) মাজারে কেন নয়—বর্তমানে এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে স্থানীয়দের মনে। মাজারের সম্পত্তি রক্ষা ও অসাধু সিন্ডিকেটের হাত থেকে এটি মুক্ত করতে এখন পুরো সিলেটবাসী তাকিয়ে আছেন বর্তমান জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন-এর দিকে। ৩০ সেপ্টেম্বরের শুনানির পর সাবেক ডিসির শুরু করা অসমাপ্ত সংস্কার তিনি কতটা পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে পারেন, সেদিকেই নজর সবার।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: