৮ ইঞ্চির বেইজ হচ্ছে ২ ইঞ্চি
দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ সাড়ে ৩২ কোটি টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে হরিলুট
সিলেটের অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সম্মুখভাগ থেকে শুরু করে ফেঞ্চুগঞ্জের কটালপুর পর্যন্ত দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের কোটি কোটি টাকার সংস্কার ও পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ভয়াবহ ও নজিরবিহীন অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সাড়ে ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা উন্নয়ন প্রকল্পটি কোনো ধরনের আইনি ও কারিগরি কার্যাদেশ (ওয়ার্ক অর্ডার) অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সম্পাদন করা হচ্ছে না। মূল কার্যাদেশের (বেইজ টাইপ-১) সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী ও প্রকৌশল নকশা অনুযায়ী, পুরোনো জরাজীর্ণ রাস্তার বিটুমিনাস সম্পূর্ণ উপড়ে বা স্ক্যরিফাই করে ফেলে দিয়ে সেখানে নতুন করে ৮ ইঞ্চি পুরুত্বের বেইজ টাইপ-১ স্তর তৈরি করার কঠোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে; কিন্তু বাস্তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাঠপর্যায়ে জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে আট ইঞ্চির পরিবর্তে মাত্র দুই থেকে তিন ইঞ্চি পুরুত্বের কাজ করে বাকি সরকারি টাকা লুটে নিচ্ছে। শুধু তাই নয়, এই সংস্কার কাজের সামগ্রিক গুণগত মান ও উপকরণ ব্যবহার নিয়েও সুশীল সমাজ ও স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ও সংবেদনশীল প্রশ্ন উঠেছে; নিয়মবহির্ভূতভাবে নামমাত্র কাজ করে কোটি কোটি টাকা তুলে নেওয়ার পাঁয়তারা চলায় এই জনগুরুত্বপূর্ণ ও হেভি-ভেহিকল চলাচলের প্রধান সড়কটির স্থায়িত্ব ও টেকসই হওয়া নিয়ে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এদিকে গত বছরের নভেম্বর মাসে এই মেগা প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলেও দীর্ঘ ছয় মাস অতিবাহিত হওয়ার পর আজ অবধি কাজের মাত্র ৩০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে; আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ বুঝিয়ে দেওয়ার সরকারি ডেডলাইন থাকলেও ঠিকাদারের চরম ধীরগতি ও গাফিলতির কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ কোনোভাবেই শেষ হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ভুক্তভোগী স্থানীয়রা। এ পরিস্থিতিতে কাজের চরম কচ্ছপগতির কারণে সড়কে প্রতিদিন ধুলোবালি ও কাদার সৃষ্টি হয়ে সাধারণ যাত্রী ও চালকদের চলাচলে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
সম্প্রতি দক্ষিণ সুরমা থেকে ফেঞ্চুগঞ্জ সড়ক এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, প্রকল্পের প্রধান অংশ অর্থাৎ দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সম্মুখভাগ থেকে মোগলাবাজার পর্যন্ত দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অংশে আজ অবধি সংস্কারের কোনো প্রাথমিক কাজই স্পর্শ করা হয়নি; মোগলাবাজারের পর থেকে কয়েক কিলোমিটার অংশের পুরোনো বিটুমিন কোনো রকমে উঠিয়ে বালু ও নিম্নমানের পাথর মিশিয়ে রুলিং করে ফেলে রাখা হয়েছে। আবার কটালপুর এলাকার দিকে আরও কয়েক কিলোমিটার অংশে তড়িঘড়ি করে নামমাত্র নিম্নমানের পিচের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে; সিলেট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের প্রত্যক্ষ আওতাধীন ‘পিএমপি’ বা পর্যায়ক্রমিক রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের আওতাধীন এই বিশাল কাজটি দরপত্রের মাধ্যমে পায় চট্টগ্রাম জেলার লাইসেন্সধারী প্রভাবশালী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স’। সড়কটির দীর্ঘমেয়াদি টেকসই মেরামত, ডিবিএস বেস কোর্স, ডিবিএস ওয়ারিং কোর্স, রোড মার্কিং, দিকনির্দেশনা গ্যান্ট্রি, ট্রাফিক সাইন ও আধুনিক সাইনপোস্ট স্থাপনের জন্য এই মেগা প্রকল্পে মোট ব্যয় বা বাজেট ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৪৯ লাখ Sixty-two হাজার ৯২০ টাকা। সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, গত ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর সওজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মূল চুক্তি সই হওয়ার পর ২৭ নভেম্বর থেকে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হয় এবং চলতি ২০২৬ সালের ২৪ আগস্টের মধ্যে সম্পূর্ণ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করার আইনি চুক্তি রয়েছে; কার্যাদেশ ও সওজের টেকসই শর্তানুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক প্লান্ট (Basin Plant) প্রযুক্তির মাধ্যমে পিচ ও পাথরের মিশ্রণ প্রস্তুত করে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সড়কে কাজ করার কথা ছিল। ত
বে সরেজমিনে ও স্থানীয়দের সরাসরি অভিযোগ উঠেছে যে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বেশি লাভের উদ্দেশ্যে ব্যয়বহুল বেসিন প্লান্ট ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ ব্যাকডেটেড ‘অ্যাসফল্ট মেশিন’ দিয়ে যত্রতত্র কাজ করছে, যার ফলে পিচ ঢালাইয়ের কোনো গুণগত মান বা স্থায়িত্ব বজায় থাকছে না; পুরোনো বিটুমিন উঠিয়ে যেখানে ৬ ইঞ্চি নিখুঁত পুরুত্বসহ মোট ৮ ইঞ্চি বেইজ টাইপ করার কথা ছিল, সেখানে বালু-পাথর মিশিয়ে রুলিং শেষে নামমাত্র পিচঢালার পর সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুত্ব ও উচ্চতা কোথাও দৃশ্যমান হচ্ছে না।
সরেজমিনে মোগলবাজার থেকে মির্জাপুর-মাহমুদাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, পুরোনো রাস্তার বিটুমিন সরিয়ে নেওয়ার পর বালু-পাথরের মিশ্রণ রুলিং করে যত্রতত্র ফেলে রাখায় সামান্য বৃষ্টিতেই তা কাদায় রূপ নিচ্ছে এবং রোদ উঠলে পুরো এলাকা ধুলোয় অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে; কটালপুর এলাকায় যে কয়েক কিলোমিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তার ফিনিশিং ও কার্পেটিং অত্যন্ত নড়বড়ে হওয়ায় কাজের মান নিয়ে তীব্র খুব প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। সড়ক এলাকার মাহমুদাবাদ গ্রামের এক ক্ষুব্ধ বাসিন্দা জানান, ঠিকাদারের লোকজন কোনো ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছামতো যেনতেনভাবে কাজ করছে; রাস্তায় গাড়ি চললে পাথর ছিটকে পড়ছে, শুষ্ক সময়ে ধুলোবালিতে টেকাই দায় আর সামান্য বৃষ্টি হলেই সড়কে সাতার কাটার মতো কাদার সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে উত্তর কুশিয়ারা ইউনিয়ন পরিষদের সম্মানিত চেয়ারম্যান আহমদ জিলু কাজের এই চরম ধীরগতি ও অনিয়ম নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “কাজে ঠিকাদারের সীমাহীন ধীরগতির কারণে এই অঞ্চলের হাজার হাজার মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াত ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে; আমরা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে বার বার মৌখিক ও লিখিত তাগদা দেওয়ার পরও ঠিকাদারি সিন্ডিকেটের কোনো টনক নড়ছে না এবং কাজে গতি আসছে না। একটি সরকারি সড়ক তো আর প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেরামত করা হবে না; এই একই সড়কে আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে সওজের করা আরেকটি কাজ এখনও চমৎকার ও অক্ষত অবস্থায় রয়েছে, অথচ বর্তমানের এই নতুন ও ব্যয়বহুল কাজটি দেখে সাধারণ মানুষও বুঝতে পারছে যে এটি এক বর্ষাও টেকসই হবে না। দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যেখানে ইতোমধ্যে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে দেশের যেকোনো বড় উন্নয়ন কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি ও অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না, সেখানে সওজের নাকের ডগায় ৩২ কোটি টাকার কাজে এমন পুকুরচুরি কীভাবে পার পেয়ে যায়, তা আমাদের বোধগম্য নয়।”
উন্নয়ন কাজের এই ন্যাক্কারজনক ধীরগতি ও ৮ ইঞ্চির বেইজ ২ ইঞ্চি করার চাঞ্চল্যকর বিষয়ে সরাসরি জানতে চাইলে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্সের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় ম্যানেজার গৌর দ্বীপ কাজের কারিগরি ও ভেতরের পুরো তথ্য জানেন না বলে সমকালকে এড়িয়ে যান; তবে তিনি জানান, তাদের মূল প্রতিষ্ঠানের নিযুক্ত একটি সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিলেটে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে এবং সিলেটে তাদের নিজস্ব বেসিন প্লান্ট রয়েছে। পরবর্তীতে এই প্রকল্পের বিষয়ে ছায়া ঠিকাদার হিসেবে কথা বলেন স্থানীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল প্রতিনিধি মুন্না আহমদ; তিনি কাজের এই চরম ধীরগতি ও ভোগান্তির প্রসঙ্গে নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, “কাজের শুরুতে গত বছরের শেষে জ্বালানি সংকট ও তেল না পাওয়ায় আমাদের প্রায় এক মাস দেরি হয়েছিল; তবে আমরা সওজের কার্যাদেশ মেনেই কাজ করছি।” ৮ ইঞ্চির পুরুত্ব কম দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি আরও দাবি করেন, তারা সিলেটের শিববাড়ী এলাকায় একটি বড় বেসিন প্লান্ট ভাড়া নিয়ে সেখান থেকেই আধুনিক নিয়মে কাজ পরিচালনা করছেন।
কোটি টাকার এই জনগুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রকল্পের এমন হরিলুট ও জালিয়াতির বিষয়ে সিলেট সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী খাইরুল বাশার মোহাম্মদ সাদ্দাম হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সওজের নিয়মিত তদারকির কথা দাবি করে গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি বেসিন প্লান্ট না এনে সম্ভবত স্থানীয় একটি বেসিন প্লান্ট ভাড়া নিয়ে কাজ করছে; তবে কার্যাদেশের পুরুত্ব কম দেওয়া বা অ্যাসফল্ট মেশিন ব্যবহারের অন্যান্য অনিয়মের বিষয়ে আমরা অবগত আছি এবং আমাদের মাঠপর্যায়ের উপ-সহকারী প্রকৌশলীরা কাজটি নিয়মিত কড়া তদারকি করছেন, কোনো ধরনের ত্রুটি বা অনিয়ম ধরা পড়লে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চূড়ান্ত বিল আটকে দেওয়া হবে।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: