হাওরে প্রথম বারের মতো মাছ ধরা নিষিদ্ধ
জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় সুনামগঞ্জের ১ লাখ ২১ হাজার জেলে
দেশের মৎস্যভাণ্ডার ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আধার সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে দেশীয় মাছের বংশবৃদ্ধি ও নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রজনন নিশ্চিত করতে দেশের ইতিহাসে সম্পূর্ণ প্রথম বারের মতো টানা এক মাসের জন্য সব ধরনের মাছ ধরার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বা ‘ব্যান পিরিয়ড’ ঘোষণা করেছে সরকার; সরকারের এই বিশেষ জরুরি নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৯ মে থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা আগামী ২৮ জুন (২০২৬) পর্যন্ত হাওরের জলমহালগুলোতে বলবৎ থাকবে। এই সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মাঝে হাওরের সুস্বাদু দেশীয় মাছের ডিমওয়ালা মা মাছ, রেণু ও পোনা মাছ রক্ষায় সব ধরনের জাল, পলো বা নৌকার সাহায্যে মৎস্য আহরণ সম্পূর্ণ বেআইনি ও বন্ধ থাকবে; তবে সরকারের পরিবেশ ও জাতীয় মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের এই প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক জেলেদের জন্য কোনো ধরনের বিকল্প সরকারি প্রণোদনা, ভিজিএফ (VGF) কার্ড বা জরুরি খাদ্য সহায়তার চাল বরাদ্দ বা ঘোষণা না থাকায় হাওরপাড়ের লাখো মৎস্যজীবীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তার প্রধান কার্যালয়ের নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান ও সূত্র থেকে জানা গেছে, সমীকরণ অনুযায়ী জেলাজুড়ে বর্তমানে প্রকৃত মৎস্যজীবীর মোট সংখ্যা ১ লাখ ২১ হাজার ৭৪৩ জন; যার মধ্যে সরকারি তালিকায় চূড়ান্ত নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৯২ Counts-এ ১৬৯ জন। এই হাওর জেলাটিতে প্রতি বছর গড়ে মাছ উৎপাদন হয় ১ লাখ ১৭৭ মেট্রিক টন, যেখানে স্থানীয় বার্ষিক চাহিদা মাত্র ৫৬ হাজার ৩৭২ মেট্রিক টন এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে প্রতি বছর জাতীয় গ্রিডে উদ্বৃত্ত থাকে ৪৩ হাজার ৮০৫ মেট্রিক টন সুস্বাদু দেশীয় মাছ; দেশের সামগ্রিক প্রোটিন ও মৎস্য উৎপাদনে প্রতি বছর এমন গুরুত্বপূর্ণ ও অসামান্য অবদান রাখলেও হাওরাঞ্চলের এই ভাগ্যবিড়ম্বিত জেলেরা এক মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞায় এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার ও দৈনিক জীবিকা নির্বাহের চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
হাওরপাড়ের শতশত জেলের তীব্র অভিযোগ, মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির স্বার্থে সরকার আইন করে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করলেও এই দীর্ঘ এক মাস তাঁদের বেঁচে থাকার জন্য বিকল্প আয়ের কোনো কর্মসংস্থান বা আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা প্রশাসন করেনি; ফলে ভরা বর্ষার মুখে এক মাস সম্পূর্ণ কর্মহীন ও ঘরে বসা থেকে পরিবার-পরিজন এবং কোলের শিশুদের মুখে কীভাবে দু’মুঠো অন্ন তুলে দেবেন, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও চরম মানসিক ট্রমার মধ্যে পড়েছেন তাঁরা। কারণ, হাওরের সিংহভাগ জেলে পরিবারই প্রতিদিন নদী-হাওর থেকে ধরা তাজা মাছ বাজারে বিক্রি করে প্রাপ্ত দৈনিক আয়ের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল; ফলে মাছ ধরা এক দিন বন্ধ থাকলে যেখানে উনুন জ্বলে না, সেখানে টানা এক মাস মৎস্য শিকার বন্ধ থাকলে তাঁদের সংসারে তীব্র ও ভয়াবহ খাদ্য সংকট নেমে আসবে।
সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরহাটি ইউনিয়নের বড়খলা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ও দীর্ঘদিনের পেশাদার মৎস্যজীবী আব্দুস সোবাহান নিজের অসহায়ত্ব ও বাস্তব চিত্র তুলে ধরে এই প্রতিবেদককে বলেন, “আমাদের এই এলাকার টগার হাওরে শুষ্ক মৌসুমে একমাত্র বোরো ধান চাষ আর বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানিতে মাছ ধরে আমরা বংশপরম্পরায় জীবিকা নির্বাহ করি; সরকার মাছের ডিম ছাড়ার ও প্রজনন রক্ষার জন্য আইন করেছে, এটা অবশ্যই দেশের স্বার্থে ভালো উদ্যোগ। তবে আমাদের মতো গরিবের পেট বাঁচানোর জন্য মাছ ধরা বন্ধ রাখার পাশাপাশি এই এক মাস আমাদের জন্য কোনো সরকারি বিকল্প চাল-ডাল বা আয়ের ব্যবস্থাও করা উচিত ছিল; তা না হলে এই বৈরি আবহাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোনো পথ থাকবে না; অনেক পরিবার আছে যাদের ঘরে এক ছটাক ধান নেই, চালও নেই এবং এবারের আগাম বন্যায় বোরো ফসলও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে তাঁদের জীবন-জীবিকা চরম সংকটে পড়বে এবং পেটের তাগিদে অনেককে হয়তো পৈতৃক ভিটেমাটি ও এলাকা ছেড়ে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো অন্যত্র সস্তা শ্রমের কাজের সন্ধানে চলে যেতে হবে।”
অনুরূপভাবে জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা আরেক ভুক্তভোগী মৎস্যজীবী মো. আনোয়ার হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে নিজের মতামতে বলেন, “সরকার হাওরে শিলাবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন সময় পর্যাপ্ত কৃষিঋণ, সার, বীজ, নগদ সহায়তা ও চালের প্রণোদনা দিয়ে থাকে এবং ধান চাষের মৌসুমেও কৃষকরা নানা ধরনের সরকারি সুবিধা পান, যা প্রশংসনীয়; কিন্তু আমরা যারা নদী-হাওরে জীবন বাজি রেখে মাছ ধরে দেশের মানুষের পেটের খোরাক জোগাই, সেই নিবন্ধিত জেলেদের জন্য তেমন কোনো টেকসই সহায়তার ব্যবস্থা আমরা কখনোই চোখে দেখিনি। মাছের উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর লক্ষ্যে এক মাসের জন্য মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এটি দীর্ঘমেয়াদে ভালো উদ্যোগ হলেও এই কঠিন সময়ে আমরা পরিবার-পরিজন নিয়ে কীভাবে তিন বেলা খেয়ে চলব, সরকারের নীতিনির্ধারকদের সেটাও মানবিক বিবেচনায় নেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।”
জেলেদের এই মানবিক ও জীবন-জীবিকার সংকট এবং ক্ষোভের বিষয়ে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আল-মিনান নূর সরকারের এই পরীক্ষামূলক পাইলট প্রজেক্টের সত্যতা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমের সামনে বলেন, “হাওরাঞ্চলে বিপন্ন দেশীয় মাছের নিরাপদ প্রজনন ও প্রজাতি বংশবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পরীক্ষামূলকভাবে এবারই প্রথম বারের মতো এক মাসের জন্য সব ধরনের মাছ ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে; যেহেতু এটি সম্পূর্ণ নতুন ও পরীক্ষামূলক একটি বিশেষ প্রোগ্রাম, তাই বর্তমানে মাঠপর্যায়ের জেলেদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো সরকারি প্রণোদনা বা বিশেষ খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা প্যালেনভুক্ত রাখা সম্ভব হয়নি। তবে হাওরের মৎস্যজীবীদের আন্তরিক সহযোগিতায় সরকারের এই সংরক্ষণ কর্মসূচিটি যদি এ বছর শতভাগ সফল ও ফলপ্রসূ হয়, তবে আগামী বছর থেকে নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সময়ে জেলেদের জীবন ধারণের জন্য চাল ও আর্থিক প্রণোদনার বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে পারে; যদিও এই বিষয়ে উচ্চপর্যায় থেকে এখনো কোনো চূড়ান্ত বা লিখিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।”
এ রহমান
মন্তব্য করুন: