সুনামগঞ্জে জমজমাট শতবর্ষী ‘নাও মহাল’
বর্ষা এলেই সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নৌকার কদর বাড়ে। হাওরের জলপথে চলাচল, মাছ ধরা, পণ্য পরিবহন কিংবা বিয়ের শোভাযাত্রা সবকিছুতেই প্রয়োজন পড়ে নৌকার। আর এই নৌকার প্রধান ক্রয়কেন্দ্র হয়ে ওঠে মধ্যনগর বাজারের শতবর্ষী নৌকার হাট, যেটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘নাও মহাল’ নামে।
প্রতি শনিবার মধ্যনগর বাজারের কাচারীঘাট ঘেঁষা গোরাডোবা হাওরে বসে এ ভাসমান হাট। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বিক্রেতা-ক্রেতার মিলনমেলা। সারিবদ্ধভাবে বাঁধা নৌকার সারি, দামাদামি আর গুনে দেখা—সব মিলিয়ে হাটজুড়ে থাকে উৎসবের আমেজ।
এই হাটে পাওয়া যায় খিলুয়া, কুশি, সরঙ্গা, চাচতলী, চডানাউ, বারকি ইত্যাদি নানা রকম নৌকা। মাকরদী গ্রামের নৌকার কারিগর সুস্থির রঞ্জন সরকার জানান, ‘এবার ১০-১২ হাত মাপের নৌকা ৬-৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আকার অনুযায়ী দাম ২০-২৫ হাজার টাকাও হয়।’
ইজারাদারদের ভাষ্যমতে, একেক হাটে কয়েকশ নৌকা কেনাবেচা হয়। শুধু মধ্যনগর নয়, তাহিরপুর, ধর্মপাশা থেকে শুরু করে নেত্রকোনার কলমাকান্দা, বারহাট্টা থেকেও মানুষ আসে হাটে।
এই হাটের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ১৯২০-এর দশকে গৌরীপুরের জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় মধ্যনগরে একটি পুকুর খনন করালে তার পাশে গড়ে ওঠে বাজার ও নৌকার হাট। সেই থেকে শত বছর ধরে টিকে আছে ‘নাও মহাল’।
মধ্যনগরের প্রবীণ সমাজকর্মীরা বলেন, ‘এই হাট শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়, হাওরবাসীর জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। এক সময় এ হাট ঘিরে গ্রামীণ মেলা, পালা-পার্বণ, গান-বাজনার ধারা থাকলেও সেসব এখন হারিয়ে যাচ্ছে।’ তারা চান, এই ঐতিহ্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হোক।
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, ‘ছয় মাস নাও ছয় মাস পাও—এটাই হাওরের বাস্তবতা। শতবর্ষী এই নৌকার হাট হাওরবাসীর জীবনযাত্রার প্রতিচ্ছবি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে হাটের সার্বিক উন্নয়ন ও ঐতিহ্য রক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’
তিনি জানান, ‘হাটে আসা বিভিন্ন ধরনের নৌকার ডামি সংরক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।’
বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হাওরের বুক জুড়ে যখন ঢেউ খেলে যায়, তখন ভাসমান নাও মহালে জীবনের অন্য এক গল্প লেখা হয়—যা শুধু কেনাবেচার গল্প নয়, হাওরের সংস্কৃতি, কষ্ট আর টিকে থাকার লড়াইয়েরও গল্প।
মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: