হবিগঞ্জে এনসিপি’র কর্মসূচিতে পুলিশের বাঁধা, ১৪৪ ধারা জারি, বিজিবি মোতায়েন
হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক উত্তেজনাকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি। পথে পথে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের বাধা দেওয়া হয়েছে। একাধিক বাধা অতিক্রম করে এনসিপি নেতারা হবিগঞ্জ জেলায় ঢুকলে বাহুবলে তাদের আবারও আটকে দেয় পুলিশ। এসময় বৃষ্টির মধ্যে তারা সেখানে রাস্তায় বসে অবস্থান নেন। সন্ধ্যার পর সেখানে প্রেসব্রিফিং করেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
এসময় তিনি বলেন, “গতকাল (মঙ্গলবার) হবিগঞ্জে হামলায় এনসিপির ৩০ জনের মতো নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। সেখানে প্রতিবাদ-মিছিল করার জন্য যাচ্ছিলেন। কিন্তু বার বার পুলিশ বাধা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত পুলিশকে বলা হয়, গতকালের ঘটনায় মামলা করার জন্য এবং আহতদের দেখার জন্য হবিগঞ্জে এনসিপির মাত্র পাঁচজন নেতা যাবেন। তাও যেতে দেওয়া হয়নি।”
এদিকে হবিগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় হবিগঞ্জ সদর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে দলটি। বুধবার রাত ৮ টার পর পুলিশের চারটি ব্যারিকেড, বালুবাহী ট্রাক ও যানবাহনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্পে পৌঁছে অভিযোগ জমা দেন এনসিপির নেতাকর্মীরা। এ সময় হবিগঞ্জের জেলা পুলিশ সুপারের উপস্থিতিতে অভিযোগ গ্রহণ করা হয়। দলটির মিডিয়া উইংয়ের পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
হবিগঞ্জ পৌর শহরে বুধবার বেলা ৩টায় সমাবেশের ডাক দিয়েছিল এনসিপি। একই সময়ে পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেয় হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল। দুই পক্ষের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এড়াতে জেলা প্রশাসন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করে। পরে সেখানে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয় এনসিপি। সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে হবিগঞ্জ যাওয়ার পথে বারবার আটকে দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় নেতাদের।
এদিকে হবিগঞ্জে সংবাদ সম্মেলনে যাওয়ার পথে ব্যাপক পুলিশি বাধার মুখে পড়েন এনসিপি কেন্দ্রীয় নেতারা। বুধবার চারটার দিকে শ্রীমঙ্গল উপজেলার সাতগাঁও এলাকায় চা-কন্যা ভাস্কর্যের সামনে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে এনসিপির গাড়িবহর আটকে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের সেই ব্যারিকেড ভেঙে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জের পথে রওনা দেন তারা। ব্যারিকেডের সামনে পুলিশের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক বাগ্বিতণ্ডা শেষে বুধবার বিকেল পাঁচটার দিকে রওনা হন তাঁরা।
ওই গাড়িবহরে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জাতীয় নারী শক্তির সদস্যসচিব মাহমুদা মিতুসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
ব্যারিকেডের সামনে বাগ্বিতণ্ডার সময় পুলিশের এক কর্মকর্তাকে উদ্দেশ করে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য থ্রেট (হুমকি) কারা? নিরাপত্তার থ্রেট কারা? আপনি তাদের না ধরে, আমাদের রাস্তা আটকাচ্ছেন? আপনি হবিগঞ্জে হচ্ছে ১৪৪ ধারা দিসেন, শ্রীমঙ্গলের রাস্তা আটকাচ্ছেন? আপনি আনলফুল (বেআইনি) কাজ করতেসেন। তাহলে আপনি আবার কথা বলতেসেন কেন? আপনি আইনের লোক না, আপনি আইনের লোক তো? বলেন কোন আইনে আপনি আমাকে এখানে বাধা দিচ্ছেন?
তখন পুলিশের একজনকে বলতে শোনা যায়, তাঁদের সীমানা পাড় হলে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তখন হাসনাত বলেন, ‘ক্ষতি হতে পারে, ক্ষতি হতে পারে। তাইলে আপনি যদি পারেন সিকিউরিটি দিবেন, যদি না পারেন তাহলে আমরা আমাদের দায়িত্ব নিয়ে চলে যাব।’
এনসিপির নেতাদের অভিযোগ, হবিগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রাকালে পুলিশ তাঁদের সামনে এগোতে নিরুৎসাহিত করে। তখন নেতা-কর্মীদের গাড়িবহর চ-কন্যা ভাস্কর্যের সামনেই অবস্থান নেয়।
এই বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার সময় জেলার বাহুবল উপজেলার কামাইছড়ায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তাদের বাধা দিয়েছে পুলিশ। এ সময় মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে এনসিপি নেতারা সেখানে অবস্থান করেন।
বহরে থাকা এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করতে যাওয়ার পথে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তিন জায়গায় আমাদের আটকে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে পুলিশ দিয়ে, তারপর রাস্তায় ট্রাক আটকে চাকা পাংচার করে এবং সর্বশেষ রাস্তার ওপর ট্রাক্টর রেখে আটকে দেওয়া হয়েছে। কামাইছড়া এলাকায় পুলিশের বাধার মুখে সন্ধ্যা সাতটা পাঁচ মিনিটে প্রেস ব্রিফিং করেন হাসনাত আব্দুল্লাহ।
এদিকে এনসিপি এবং বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। সেইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শহরের বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ এবং অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তিন প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বুধবার সকালে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজের সই করা এক আদেশে জরুরি ভিত্তিতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়।
জেলা প্রশাসন জানায়, এনসিপি বুধবার হবিগঞ্জ শহরে বিক্ষোভ সমাবেশ ও পথসভার কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। একই স্থানে এবং একই সময়ে হবিগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি এবং জেলা ছাত্রদল ও যুবদল পাল্টা প্রতিবাদ সমাবেশ ও অবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয়। উভয় পক্ষের কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর সমাগম এবং এর জেরে সংঘর্ষ, জানমালের ক্ষয়ক্ষতি ও জনশান্তি বিনষ্টের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্ত নেয়।
এই আদেশের ফলে হবিগঞ্জ পৌর এলাকায় পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ, জনসভা, মিছিল, স্লোগান, পিকেটিং, মাইকিং এবং উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী যেকোনো কার্যক্রম পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। আদেশটি জারির সঙ্গে সঙ্গেই কার্যকর করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক সরফরাজ নিশ্চিত করেছেন।
এরআগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এনসিপি নেতাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বুধবার বিকেল ৩টায় হবিগঞ্জে দলটি বিক্ষোভ সমাবেশ করার ঘোষণা দেয়। এতে দলের আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমের উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও পরে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে সরে আসে দলটি। তবে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ হবিগঞ্জে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সম্মেলন করবেন বলে জানায় এনসিপি।
অন্যদিকে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে এনসিপির বিরুদ্ধে ‘উসকানিমূলক মিথ্যাচারের’ অভিযোগ তুলে পাল্টা বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদল। এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে ঘিরেই শহরে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
জেলা যুবদলের সদস্যসচিব সফিকুর রহমান সেতু বলেন, এনসিপি নেতৃবৃন্দ উসকানিমূলক কথাবার্তা বলায় হবিগঞ্জের সাধারণ মানুষ তাদের কঠোর জবাব দিয়েছেন। আমরা আইন মেনে বিক্ষোভ-সমাবেশ স্থগিত করেছি। তবে যদি এনসিপি নেতৃবৃন্দ বিক্ষোভ সমাবেশ করেন, তাহলে আমরাও বসে থাকবো না।
এনসিপির উত্তরাঞ্চলের সংগঠক নাহিদ উদ্দিন তারেক বলেন, প্রশাসনের দেওয়া ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ সমাবেশ আমরা করব না। কিন্তু গতকাল যে আমাদের ওপর নরকীয় হামলা করা হয়েছে, এজন্য এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ হবিগঞ্জে এসে সংবাদ সম্মেলন করবেন। হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. তারেক মাহমুদ বলেন, ১৪৪ ধারা পালনে পুলিশ পৌরসভার বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান করছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে আমাদের কড়া নজর রয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার হবিগঞ্জ শহরে কর্মসূচি শেষে ফেরার পথে এনসিপির নেতাদের বহনকারী গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। এনসিপির পক্ষ থেকে এ হামলার জন্য বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীদের দায়ী করা হয়। হামলায় দলের কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হামলার সময় এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী হামলা থেকে বাঁচতে হবিগঞ্জ শহরের একটি সোনালী ব্যাংক শাখায় আশ্রয় নেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের সেখান থেকে উদ্ধার করে। রাতে তারা মৌলভীবাজারে অবস্থান করেন।
তাহির আহমদ/ মীর্জা ইকবাল
মন্তব্য করুন: