আমেরিকায় সেলিনা, লন্ডনে হেলেন: অব্যাহত সিলেটের ভূমি জালিয়াতি
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেনের রাজনৈতিক ক্ষমতার আড়ালে সিলেটে দুর্নীতির এক অদম্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন তার স্ত্রী সেলিনা মোমেন। ড. মোমেন প্রকাশ্যে নিজেকে মন্ত্রী পরিচয় দিলেও কার্যত সিলেটের প্রকৃত ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল তার স্ত্রী সেলিনার হাতেই। প্রকাশ্যে এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী তাকে 'আমার বস' বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পরপরই সিলেটের প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক কাজের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিজের কবজায় নিয়ে নেন সেলিনা। সিলেট-১ আসনের ছোট-বড় সকল টেন্ডার, কাবিথা ও সরকারি প্রকল্প থেকে শুরুতেই ২৫ শতাংশ কমিশন আদায় বাধ্যতামূলক করে ফেলেন তিনি। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ টাকা সহজে বৈধ ও হজম করতে গড়ে তোলেন 'সেলিনা-মোমেন ফাউন্ডেশন'।
সেলিনা মোমেনের এই সুবিশাল দুর্নীতি ও কমিশন সিন্ডিকেট বাস্তবায়নের মূল কারিগর ও ডানহাত হিসেবে মাঠে সক্রিয় ছিলেন বিতর্কিত মহিলা লীগ নেত্রী হেলেন আহমেদ। সিলেটে ভূমিদস্যু ও জালিয়াতি হিসেবে পরিচিত এই হেলেন আহমেদ এবং মন্ত্রীর এপিএস জুয়েল মিলে গড়ে তোলেন কঠোর এক চাঁদাবাজ চক্র। সরকারি প্রকল্পের যেকোনো ঠিকাদারকে কাজের বিলের চেক নেওয়ার আগেই ২৫ শতাংশ টাকা নগদে ‘ম্যাডাম’ সেলিনা মোমেনের উদ্দেশ্যে অগ্রিম পরিশোধ করতে হতো। পিআইও হিরন মাহমুদের মাধ্যমে আদায় করা সেই কমিশন ও ঘুষের হিসাব প্রতিদিন কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নিতেন হেলেন আহমেদ ও জুয়েল।
প্রকল্পের কাজ বা টেন্ডার বাণিজ্যের পাশাপাশি পাসপোর্ট অফিস ও বিমানবন্দর কেন্দ্রিক অপরাধ সাম্রাজ্যও নিয়ন্ত্রণ করতেন এই দুই নারী সিন্ডিকেট। সিলেট পাসপোর্ট অফিস থেকে প্রতি মাসে ৩০ লাখ টাকারও বেশি কমিশন যেতো সেলিনা মোমেনের পকেটে। এছাড়া আদম পাচারের ভুয়া খদ্দের বানিয়ে মন্ত্রণালয়ের প্যাডে রিকোয়েস্ট লেটার ইস্যু করে জনপ্রতি ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার নেপথ্যে প্রধান ভূমিকা পালন করতেন হেলেন আহমেদ।
অভিযোগ রয়েছে, চব্বিশের ৫ আগষ্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর সেলিনা মোমেনের সাথে হেলেন আহমদও পালিয়ে যান যুক্তরাজ্যে। সেখানে থেকেও ভূমি জালিয়াতি ও দখল বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন আগের মতো করে। এ ব্যাপারে সিলেটের এক মন্ত্রীর আশির্বাদ রয়েছে বলেও একটি বিশ্বস্ত সূত্র দাবি করেছে। একই সাথে বিদেশে পলাতক থেকেও হেলেন আহমদ তার সহযোগীদের দিয়ে বিভিন্ন লোকজনের নামে একের পর এক ভুয়া ও মিথ্যা মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন। সেলিনা মোমেন ফাউণ্ডেশন এখন পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও হেলেন আহমদের ভুমি জালিয়াতি ব্যবসা এখনও চলছে সমানতালে।
ভুক্তভোগীরা জানান, শুধু সরকারি প্রকল্পই নয়, সীমান্ত কেন্দ্রিক চোরাচালান এবং অবৈধ ভিসা বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন সেলিনা ও হেলেন। পরবর্তীতে গণঅভ্যুত্থান ও সরকারের পতনের মুখে নিজেদের অপকর্ম আড়াল করতে জুলাই বিপ্লবের আগেই সেলিনা মোমেন আমেরিকায় পালিয়ে যান। অন্যদিকে তার অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতি হেলেন আহমেদ বর্তমানে মামলায় লন্ডনে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের অঢেল অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার দাবি জানিয়েছে সিলেটের স্থানীয় সচেতন মহল।
নীরব চাকলাদার/ প্রসি-২০২৬
মন্তব্য করুন: