দোয়ারাবাজারে আল ইসলাহ’র ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন
রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে উম্মাহর কল্যাণে কাজ করার আহবান হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলীর
দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ও ইসলামের সুমহান আদর্শ রক্ষায় সব ধরনের রাজনৈতিক মতভেদ ও পারস্পরিক বিভাজন ভুলে উম্মাহর সার্বিক কল্যাণে একযোগে কাজ করার জন্য সকল রাজনৈতিক দল ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহর কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী।
আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলা মডেল মসজিদ কমপ্লেক্স মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ দোয়ারাবাজার উপজেলা শাখার এক বিশাল ও বর্ণাঢ্য ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন। সম্মেলনে দেশের চলমান অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোকে কড়া ভাষায় আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে আল্লামা ফুলতলী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “যেকোনো ধরনের জুলুম, নির্যাতন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া প্রতিটি ঈমানদার ও স্বাধীন মানুষের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব; সমাজে প্রতিষ্ঠিত কোনো জালিমের পক্ষাবলম্বন করা কিংবা কোনো অন্যায়ের সঙ্গে সামান্যতম আপস করা পবিত্র ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও আদর্শের পরিপন্থী।” জুলাই পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন ও দলগুলোর দ্বিমুখী আচরণের তীব্র সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, “আমরা দেখেছি ঐতিহাসিক জুলাই গণআন্দোলনের পর দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একযোগে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দিয়েছিল এবং তাদের ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার ছিল; কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো, বর্তমানে সেই একই রাজনৈতিক মহল ও দলগুলো আবার বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘নব্য ফ্যাসিস্ট’ বলে সস্তা রাজনীতি করছে; তাই দেশের সাধারণ জনগণের কাছে আমার প্রশ্ন ও জানার বিষয়— পুরনো ও নতুন ফ্যাসিবাদের মধ্যে আসল পার্থক্যটা কী, সেটি এই মুহূর্তে দেশের জনগণের সামনে পরিষ্কার ও স্পষ্ট করা অত্যন্ত প্রয়োজন।”
ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা হুছামুদ্দীন চৌধুরী ফুলতলী দেশের একটি শীর্ষ রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতার সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একসময় যাদের রাজপথে বুক উঁচিয়ে ফ্যাসিস্ট বা স্বৈরাচার বলা হয়েছে, কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার রাজনৈতিক স্বার্থে তাদের সম্পর্কে ভিন্ন মূল্যায়ন বা নমনীয় বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে; বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলগুলোর এমন নীতিহীন ও দ্বৈত অবস্থান দেশের সাধারণ ও সরলমনা জনগণের মাঝে চরম বিভ্রান্তি এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় ঐক্য, সমাজে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে যেকোনো মূল্যে দায়িত্বশীল ও পরিচ্ছন্ন ভূমিকা পালন করতে হবে। আনজুমানে আল ইসলাহ দোয়ারাবাজার উপজেলা শাখার সম্মানিত সভাপতি প্রবীণ আলেম মাওলানা আব্দুল কাদিরের সভাপতিত্বে এবং বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা মর্তুজ আলীর অত্যন্ত চমৎকার ও সাবলীল পরিচালনায় অনুষ্ঠিত এই মেগা কাউন্সিলে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ইসলামের খেদমতে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন— বাংলাদেশ আনজুমানে আল ইসলাহ কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা ড. মইনুল ইসলাম পারভেজ, বাংলাদেশ আনজুমানে তালামিযে ইসলামিয়ার সাবেক সফল কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা আজির উদ্দীন পাশা, আনজুমানে আল ইসলাহ সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সহ-সভাপতি মাহমুদুর রহমান আজাদ, সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মাহবুবুর রহমান তাজুল, দেশের অন্যতম দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বুরাইয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুস ছালাম, ছাতক জালালিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আহাদ, বিশিষ্ট আলেম মাওলানা সৈয়দ মুনতাসির আলী, মাওলানা ইউনুস আহমদ, মাওলানা সাদিকুর রহমান, দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সর্বস্তরের জনগণের মনোনীত সম্ভাব্য শক্তিশালী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মাওলানা আব্দুল বাছিত খান, আনজুমানে তালামিযে ইসলামিয়া দোয়ারাবাজার (পশ্চিম) উপজেলা শাখার নবনির্বাচিত সভাপতি লায়েক সোহাগ ও (পূর্ব) উপজেলা শাখার সভাপতি শাহান আহমদ, লতিফিয়া ক্বারী সোসাইটি দোয়ারাবাজার উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা সাইফুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুজিবুর রহমান, ইয়াকুবিয়া হিফজুল কোরআন বোর্ড দোয়ারাবাজার শাখার সভাপতি হাফিজ বুরহান উদ্দীন লায়েক এবং আনজুমানে আল ইসলাহ দোয়ারাবাজার (পশ্চিম) উপজেলা শাখার সভাপতি হাফিজ শরিয়ত আলীসহ কেন্দ্রীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সর্বস্তরের শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও নেতৃবৃন্দ।
এছাড়াও দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই জাঁকজমকপূর্ণ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সাবেক সফল সভাপতি প্রবীণ মুরব্বি হাফিজ মইনুল ইসলাম, পান্ডারগাঁও ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক হাফিজ আব্দুর রউফ, বিশিষ্ট সংগঠক মাওলানা জমির উদ্দীন, মইনুল হক, হাফিজ হাসনাত আহমদ, তরুণ সমাজসেবক মাহবুবুর রহমানসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড থেকে আসা সহস্রাধিক তৌহিদী জনতা ও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী। দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে উপস্থিত বক্তারা সংগঠনের ধারাবাহিক ও গৌরবোজ্জ্বল সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারকরণ, দেশের বর্তমান সামগ্রিক জাতীয় পরিস্থিতি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে আলেম সমাজের করণীয় ও ভূমিকা নিয়ে অত্যন্ত তাত্ত্বিক ও যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেন; পরবর্তীতে বিকেলের শেষ অধিবেশনে পুরো দোয়ারাবাজার উপজেলা জুড়ে আল ইসলাহ ও তালামিযে ইসলামিয়ার সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল, শক্তিশালী ও তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সর্বসম্মতিক্রমে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত এবং প্রস্তাবনা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
মাসুদ রানা সোহাগ/এআর
মন্তব্য করুন: