স্বাপ্নিক বাউল শাহ্ আব্দুল করিমের প্রয়াণ দিবস
‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম...’— মাটির সোঁদা গন্ধ আর ভাটি অঞ্চলের হাহাকার মাখা এই সুর যার একতারায় জেগে উঠত, বাংলা গানের সেই অমর কাণ্ডারি, বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ১৭তম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০০৯ সালের এই ১২ সেপ্টেম্বরেই তিনি পার্থিব সীমানা পেরিয়ে বিলীন হয়েছিলেন পরম পুরুষের পানে। দেহ খাঁচা ছেড়ে গেলেও তিনি একবিন্দু দূর হননি; প্রতিটি বাঙালি হৃদয় আর সুরের দোলায় তিনি অমর, অক্ষয়।
১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ধল গ্রামে, কালনী নদীর তীরে এক অভাবী ঘরে জন্মেছিলেন এই মহাজাগতিক সুরের পথিক। বাবা ইব্রাহিম আলী ও মা নাইওরজান বিবির চরম দরিদ্র সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরাত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো তাঁর কপালে জোটেনি; মোড়ল বাড়ির গরু রাখালি দিয়েই শুরু হয়েছিল জীবনের লড়াই। ঈদের দিনেও ছুটি মিলত না কিশোর করিমের। ডুকরে ওঠা সেই বুকফাটা কান্না লিখেছিলেন নিজের গানে— ‘মাঠে থাকি গরু রাখি, ঈদের দিনেও ছুটি নাই, এই দুঃখ কার কাছে জানাই।’
কিন্তু যার অন্তরে স্বয়ং সুরের দেবী বসত করেন, তাঁকে কি আর দারিদ্র্য শিকলে বাঁধতে পারে? মাঠে গরু তাড়ানোর ফাঁকেই দোতারায় আঙুল ছোঁয়াতেন, ভাটির বাতাসে ভাসিয়ে দিতেন নিজের বাঁধার সুর। গ্রামের গানপাগল সাধক করম উদ্দিনের কাছে সুরের প্রথম তালিম নেওয়া। পরে করম উদ্দিনের ছেলে আছদ্দর মিয়ার সঙ্গে মালজোড়া গানের আসরে যেতেন করিম। সংসারের টানাপোড়েন, অনাহার—কিছুই তাঁর ভাবুক মনকে দমাতে পারেনি। তিনি তো ছিলেন সুরের মাতাল, আত্মভোলা এক দরবেশ।
ভাটি বাংলার হাওর-বাওড় পেরিয়ে আজ শাহ আব্দুল করিমের সুর বিশ্বজুড়ে কোটি বাঙালির আত্মাকে স্পর্শ করে। ‘কেন পিরিতি বাড়াইলা রে বন্ধু’, ‘গাড়ি চলে না চলে না’, ‘আমি কুল হারা কলঙ্কিনী’, ‘বসন্ত বাতাসে সই গো’, ‘রঙের দুনিয়া আর চাই না’ কিংবা ‘সখী কুঞ্জ সাজাও গো’— তাঁর দেড় হাজারেরও বেশি সৃষ্টি আজ শুধু গান নয়, যেন প্রেম, বিরহ আর জীবনদর্শনের মহাকাব্য।
কেবল আধ্যাত্মিক আর বিরহের সুরেই বন্দি ছিলেন না এই বাউল। তিনি ছিলেন রাজনীতি সচেতন এক জাগ্রত বিবেক। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিসংগ্রাম কিংবা ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন— প্রতিবারই তাঁর একতারা রূপ নিয়েছে প্রতিরোধের হাতিয়ারে। গণমানুষের সুখ-দুঃখ আর সাম্যের কথাই ফুটে উঠেছে তাঁর ‘আপ্তাব সংগীত’, ‘গণসংগীত’, ‘কালনীর ঢেউ’, ‘জাতির চিঠি’, ‘কালনীর তীরে’ ও ‘দোলমালা’ গ্রন্থে।
একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য সম্মাননা মিললেও শাহ আব্দুল করিম ছিলেন প্রচারবিমুখ, নিরহংকারী এক মহাজন। নিজের সৃষ্টির প্রতিদান তিনি কখনোই চাননি।
তবে আফসোস কাটে না করিম ভক্তদের। সাধকের প্রয়াণ দিবসে উজানধল গ্রামে যখন দেশ-বিদেশের শত শত বাউল-প্রেমিক ছুটে আসেন, তখন তাঁদের বসার বা থাকার একটুকু ঠাঁই মেলেনি আজও। বাউল সম্রাটের ছেলে শাহ নূর জালাল আক্ষেপ করে বলেন— এক দশক আগে প্রস্তাবিত ‘শাহ্ আব্দুল করিম সঙ্গীতালয়’ ও ‘কমপ্লেক্স’ আজও কেবল কাগজে-কলমেই আটকে আছে।
আজ বিকেলে কালনীর তীরে শাহ আব্দুল করিমের ভিটেবাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আর সন্ধ্যায় বসবে সাধুদের আসর। আবার বেজে উঠবে দোতারা, বাতাসে ভাসবে সেই চিরচেনা আকুলতা— ‘আমি এই মিনতি করি রে...’
দেহ থাকলেও বাউল মরে না, করিম শাহও মরেননি। কালনীর ঢেউয়ে, বৈশাখী হাওয়ায় আর বাঙালির মরমী আত্মায় বাউল সম্রাট শাহ্ আব্দুল করিম বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।
নীরব চাকলাদার
মন্তব্য করুন: