সিলেটের জৈন্তায় ‘আদিবাসী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা’র নামে মাসব্যাপী মেলা বন্ধের নির্দেশ
সিলেটের ঐতিহাসিক ও সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ‘জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ি’ প্রাঙ্গণে আয়োজিত মাসব্যাপী 'শিল্প ও পণ্য মেলা-২০২৬' জরুরি ভিত্তিতে বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। প্রাচীন এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সুরক্ষা, ঐতিহাসিক মূল্য রক্ষা এবং প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ আইন বাস্তবায়নে এই কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয় (চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) থেকে সিলেট জেলা প্রশাসকের কাছে মেলা বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জরুরি অনুরোধ জানিয়ে একটি দাপ্তরিক পত্র প্রেরণ করা হয়েছে।
আইন ও সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ: সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ‘আদিবাসী মহিলা উন্নয়ন সংস্থা, সিলেট’-কে জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ির অধীনস্থ ইরাবতী মাঠে মাসব্যাপী এই মেলা আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯৮৪ সালের ২২ এপ্রিল বাংলাদেশ গেজেটের মাধ্যমে এই রাজবাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের মেলা বা জনসমাগমমূলক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বেআইনি।
অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, এই মেলা আয়োজন এবং মেলা সামগ্রী বহনের সময় প্রাচীন প্রবেশদ্বারের (গেইট) ক্ষতিসাধন হয়েছে, যা স্থানীয় সূত্রে এবং আলোকচিত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই ধরনের কার্যক্রম Antiquities Act, 1968 (Amended in 1976)-এর ১২ (৩) (গ) এবং ১৯(১) ধারার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত পুরাকীর্তির নিকটবর্তী স্থানে কোনো কিছু নির্মাণ, সৌন্দর্যহানি বা ক্ষতিসাধন দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া, এই কার্যক্রম বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ ও ২৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণের মূল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভূগর্ভস্থ নিদর্শনের ক্ষতি ও নান্দনিক মূল্য হ্রাসের আশঙ্কা: পত্র মারফত জানানো হয়, জৈন্তাশ্বর রাজবাড়ি প্রাঙ্গণের ভূগর্ভে বহু প্রাচীন স্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ধ্বংসাবশেষ বিদ্যমান রয়েছে। এ অবস্থায় প্রত্নস্থলের অভ্যন্তরে মেলা, সভা, সমাবেশ কিংবা অন্য যেকোনো বৃহৎ জনসমাগম পরিচালিত হলে প্রত্নসম্পদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে। এতে স্থানটির ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নান্দনিক মূল্য চিরতরে ক্ষুণ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
চলমান সংস্কার ও ভবিষ্যৎ মহাপরিকল্পনা: ঐতিহাসিক এই রাজবাড়িটি রক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিগত ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এখানে অবস্থিত প্রাচীন মেগালিথিক সমাধিগুলোর রাসায়নিক সংরক্ষণ কাজ সম্পন্ন করে। পরবর্তীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাচীন সীমানা প্রাচীরের সংস্কার কাজও সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়। এমনকি চলমান ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও জরিপের মাধ্যমে জৈন্তাপুর অঞ্চলে আরও বেশ কিছু নতুন প্রত্নস্থল শনাক্ত করা হয়েছে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর সূত্রে আরও জানা গেছে, ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের সামগ্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে এখানে পর্যটনবান্ধব টিকিটিং ব্যবস্থা চালু এবং একটি স্থায়ী কার্যালয় বা অফিস স্থাপনের মহাপরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই অবস্থায় মেলার মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রম এই পুরাকীর্তির ক্ষতিসাধন করবে।
জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান: সংরক্ষিত এই পুরাকীর্তিসহ জৈন্তাপুর উপজেলার অন্যান্য প্রত্নস্থলের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষার স্বার্থে উক্ত স্থানে ভবিষ্যতে সব ধরনের মেলা, সভা, সমাবেশ বা অনুরূপ জনসমাগমমূলক কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধের জন্য সিলেট জেলা প্রশাসককে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার বিনম্র অনুরোধ জানিয়েছে অধিদপ্তর। জাতীয় ঐতিহ্য সুরক্ষায় জেলা প্রশাসন দ্রুতই এই মেলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দেশের ঐতিহ্যপ্রেমী মহল।
মীর্জা ইকবাল/ ডি আর ডি
মন্তব্য করুন: