কোটি কোটি টাকার জাতীয় বাজেটেও ভাগ্য বদলায় না চা শ্রমিকদের

বঞ্চনা নিয়ে হতাশা শ্রীমঙ্গলের বাগানগুলোতে

কোটি কোটি টাকার জাতীয় বাজেটেও ভাগ্য বদলায় না চা শ্রমিকদের

প্রথম ডেস্ক

০৯/০৬/২০২৬ ১৯:৫৬:৪০

প্রধান উপদেষ্টা পদত্যাগ করবেন না: ফাইজ তাইয়েব আহমেদ

ভভোরের আলো ফোটার আগেই পিঠে ঝুড়ি বেঁধে কুয়াশা আর অন্ধকারের মধ্যে ঘর থেকে বের হতে হয় তাদের; সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে চা পাতা সংগ্রহের কাজ শেষে দিনশেষে যে যৎসামান্য দৈনিক মজুরি জোটে, তা দিয়ে কোনোমতে খেয়ে না খেয়ে চলে সংসার। প্রতিবছর দেশের জাতীয় সংসদে হাজার হাজার কোটি টাকার আয়-ব্যয়ের বিশাল হিসাব তুলে ধরে জাঁকজমকপূর্ণ জাতীয় বাজেট ঘোষণা করা হলেও দেশের প্রধান খনিজ ও অর্থকরী ফসল চা শিল্পের সাথে জড়িত চা শ্রমিকদের স্পষ্ট অভিযোগ— কোটি কোটি টাকার সেই জাতীয় বাজেটের সুফল কিংবা ছোঁয়া আজ অবধি পৌঁছায়নি তাদের অন্ধকার কলোনিতে। প্রতিবছর বাজেটে দেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো, শিক্ষা, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মেগা খাতে বিশাল বরাদ্দের ঘোষণা থাকলেও দিনভর কঠোর পরিশ্রম করেও কেবল ন্যায্য মজুরি, উন্নত আবাসন, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও সন্তানদের শিক্ষার ন্যূনতম মৌলিক সুযোগ থেকে বছরের পর বছর ধরে পুরোপুরি বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছেন লাখো চা শ্রমিক।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী জেরিন চা বাগানের নারী শ্রমিক অনু ছত্রী নিজের বুকফাটা ক্ষোভ প্রকাশ করে এই প্রতিবেদককে বলেন, “বাজেট কী জিনিস? সেখানে আমাদের মতো গরিব শ্রমিকদের জন্য কী থাকে? এসব বড় বড় কথা আমরা খুব একটা বুঝি না; শুধু প্রতিবছর টিভিতে শুনি যে দেশে নতুন বাজেট ঘোষণা হয়েছে। কিন্তু বাজেট হলেও আমাদের কপালে আর জীবনের পাতায় কোনো পরিবর্তন আসে না; আমরা সারাদিন বাগানে রক্ত জল করে কঠোর পরিশ্রম করি, অথচ বাজারে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম হু হু করে বাড়লেও সেই অনুপাতে আমাদের দৈনিক মজুরি বাড়ে না, এই সামান্য টাকায় সংসার চালানো দিন দিন আমাদের জন্য আরও কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।” শুধু অনু ছত্রীই নন, তার মতো শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন বাগানের হাজারো সাধারণ চা শ্রমিকের কণ্ঠে এখন কেবলই একই ধরনের তীব্র হতাশা, ক্ষোভ ও আজন্ম বঞ্চনার করুণ আকুতি শোনা যায়; তাদের দাবি, দেশ-বিদেশে সিলেটের চায়ের কদর ও চাহিদা আকাশচুম্বী হলেও শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে সবসময়ই কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সুনির্দিষ্ট সরকারি উদ্যোগের চরম ঘাটতি রয়েছে। একই বাগানের অপর নারী শ্রমিক প্রতিমা মুন্ডা চরম আক্ষেপের সুরে বলেন, “প্রতিবছর বাজেটে কোটি কোটি টাকার হিসাব ঘোষণা করা হয়, আমরা বাগানের চা দোকানে বা টেলিভিশনে তা হা করে দেখি; অথচ আমাদের হাড়ভাঙা খাটুনির দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা, বর্তমান বাজারের যুগে এই সামান্য আয়ে পরিবারের সন্তানদের মৌলিক চাহিদা আর তিন বেলা অন্ন পূরণ করাই যেখানে কঠিন, সেখানে বাজেট দিয়ে আমরা কী করব?” চা শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের প্রধান দাবি ন্যূনতম ও ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ করা হলেও বছরের পর বছর ধরে তারা এক অদৃশ্য শোষণের শিকার হচ্ছেন; জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলেছে, কিন্তু বাড়ে না তাদের শ্রমের মূল্য। শ্রমিক সোনিয়া রবিদাসের ভাষ্য, “আমরাও তো মানুষ, আমরা চাই আমাদের সন্তানরা আর আমাদের মতো বাগানের গোলামি না করে ভালোভাবে পড়াশোনা করুক, অসুস্থ হলে হাসপাতালে গিয়ে যথাযথ সরকারি চিকিৎসা পাক; তাই আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে আরও বেশি আলাদা বরাদ্দ এবং কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান ও শ্রমিক লাইন সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে— সর্বত্রই বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট, অপর্যাপ্ত ও অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশন ব্যবস্থা, জরাজীর্ণ ছনের আবাসন এবং নামমাত্র সীমিত চিকিৎসাসেবা চা শ্রমিকদের নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে; বাগানের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসাকেন্দ্র বা ডিসপেনসারিগুলোতেও নেই কোনো পর্যাপ্ত এমবিবিএস চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় জীবনরক্ষাকারী ওষুধের ব্যবস্থা, যার ফলে শ্রমিকদের গড় আয়ু ও পুষ্টির হার দিন দিন কমছে। শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভুড়ভুড়িয়া চা বাগানের প্রবীণ নারী শ্রমিক অলকা ভৌমিক নিজের জীবনের ঝুঁকি বর্ণনা করে বলছিলেন, “বাজেটের কথা কাগজের পাতায় শুনি, কিন্তু আমাদের জীবনে তার কোনো আলো দেখি না; কালবৈশাখী ঝড়-বৃষ্টি কিংবা তীব্র বজ্রপাতের মধ্যেও আমাদের খোলা মাঠে পিঠে ঝুড়ি নিয়ে পাতা তুলতে হয়। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েই স্রেফ জীবিকার তাগিদে মাঠে নামতে হয়, বাজারে দ্রব্যমূল্য যেভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে, তাতে আমাদের মতো নিম্ন আয়ের মানুষের স্রেফ বেঁচে থাকাই এখন এক বিশাল লড়াই।” চা শ্রমিকদের সর্বস্তরের দাবি— আসন্ন জাতীয় বাজেটে তাদের দৈনিক মজুরি সম্মানজনক স্তরে বৃদ্ধি, কলোনির আবাসন উন্নয়ন, মানসম্মত ফ্রি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, শতভাগ বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং শিশুদের আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে সরকারকে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট বিশেষ তহবিল বা বরাদ্দ রাখতে হবে। বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি পঙ্কজ কন্দ চা শ্রমিকদের এই ঐতিহাসিক বঞ্চনার কথা শিকার করে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, বাজেট আসলে কী এবং সেখানে চা শ্রমিকদের জন্য কী সুনির্দিষ্ট সরকারি বরাদ্দ থাকে, সে সম্পর্কে শিক্ষার অভাবে অধিকাংশ সাধারণ শ্রমিকের কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই; চা শ্রমিকদের এই স্বাধীন দেশে নিজস্ব কোনো ভিটেমাটি নেই, তারা আজীবন ভূমির মৌলিক অধিকার থেকেও সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তিনি আরও বলেন, “অতীতে আমাদের এই মানবিক দাবিগুলো জাতীয় বাজেটে কখনোই খুব একটা গুরুত্ব পায়নি; তাই বর্তমান নতুন সরকারের কাছে আমাদের একটাই আকুল প্রত্যাশা— আসন্ন জাতীয় বাজেটে দেশের অর্থনীতি সচল রাখা চা শ্রমিকদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা ও সুনির্দিষ্ট মেগা বরাদ্দ রাখা হোক, যা তাদের অন্ধকূপের জীবনমান উন্নয়নে একটি ঐতিহাসিক ও কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।”


এ রহমান

মন্তব্য করুন: